স্মৃতির বিদ্যাপীঠ মদন মোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ৭৫ বছর পুর্তি উৎসব আজ

pic himelপ্রভাষক উত্তম কুমার পাল হিমেল,নবীগঞ্জঃ স্মৃতির বিদ্যাপীঠ সিলেটের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্টান মদন মোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ৭৫ বছর পুর্তি উপলক্ষ্যে হীরক জয়ন্তী উৎসব আজ । মামনীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই উৎসবের উদ্বোধন করবেন। আর এই উৎসবকে ঘিরে এই বিদ্যাপীঠ যেন অফরুপ সাজে সেজে উঠেছে। ‘দিনগুলো মোর সোনার খাচায় রইল না, সে যে আমার নানান রঙ্গের দিনগুলো’ কবিগুরুর এ আহবান যেন আজ চিরস্মরনীয়। সময়ের পালা বদলের সাথে সাথে মানুষের জীবনের ঘড়ি পরিবর্তন হলেও এমন কিছু স্মৃতি আছে যা মানুষকে আরো অতীতের স্মৃতিতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। প্রত্যেক মানুষের জীবনেই কিছু স্মৃতিময় মুহুর্ত বা ঘটনা বিদ্যমান থাকে । সেটা হতে পারে শৈশব জীবনে, হতে পারে ব্যক্তি জীবনে, হতে পারে স্কুল-কলেজ জীবনে, হতে পারে শিক্ষা গ্রহনের উচ্চতর বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে। আমার স্মৃতিময় সেই বিদ্যাপীঠ যাকে ঘিরে আমার জীবনের সুদূর প্রসারী স্বপ্ন, চিন্তা-চেতনা ও ভবিষৎত পরিকল্পনার মহা সমন্বয় পরিবেষ্টিত সিলেটের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্টান মদন মোহন বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজ।
যে শিক্ষা প্রতিষ্টান দেশের বানিজ্য বিষয়ের জন্য সেরা ১০ টি শিক্ষা প্রতিষ্টানের মাঝে একটি। এইচ এস সি অধ্যয়নরত অবস্থায়ই স্বপ্ন দেখতাম সেই স্মৃতির বিদ্যাপীঠে পড়াশোনা করার। যেই ভাবা সেই কাজ ১৯৯৭ সালে বানিজ্য বিভাগে এইচ এস সি পাশ করার পরই সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পালা। বানিজ্য বিভাগে উচ্চ শিক্ষা গ্রহনের জন্য ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা দিয়েছিলেন নবীগঞ্জ ডিগ্রী কলেজের হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক রফিক স্যার । একদিকে তিনি বানিজ্য বিভাগে উচ্চ শিক্ষা গ্রহনের উৎসাহ দিলেও অন্যদিকে হিসাব বিজ্ঞান বিষয় নিয়ে পড়াশোন করলে মাথার চুল পড়ে যাওয়ার ভয় ও দেখিয়েছিলেন। যে ভয় আমাকে হিসাববিজ্ঞান নিয়ে উচ্চ শিক্ষা গ্রহন করার জেদ আরো অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছিল। অপেক্ষার পালা শেষ, এবার বাস্তবায়ন । ১৯৯৭ সালে বানিজ্য বিষয়ে কৃতিত্বের সাথে এইচ এস সি পাশ করার পর বি,কম (সম্মান) বিষয়ে ভর্তির জন্য আবেদন করলাম স্বপ্নের সেই শিক্ষা প্রতিষ্টান সিলেটর ঐতিহ্যবাহী মদন মোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে। মেধা তালিকার চান্সও পেয়ে গেলাম ঠিক মতোই। নবীগঞ্জ ডিগ্রী কলেজ থেকে চলে যেতে বাধা হয়ে দাড়ালেন নবীগঞ্জ ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ গোলাম হোসেন আজাদ। তিনি সাফ জানিয়ে দিলেন বি,কম পাস কোর্সে নবীগঞ্জ ডিগ্রী কলেজেই পড়তে হবে। কিন্তু আমার একান্ত নাছোরবান্দা ইচ্ছার কাছে সেই বাধাঁ অতিক্রম করে সিলেটে ভর্তির সুযোগ অবশেষে বাস্তবায়ন হলো। মেধা তালিকায় চান্স পাওয়ায় কলেজ কর্তৃপক্ষের পরামর্শে প্রথমে ব্যবস্থাপনা বিষয়ে ভর্তি হলাম সেই কাংখিত বিদ্যাপীঠ সিলেটের মদন মোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে। কলেজের অধ্যক্ষ তখন নজরুল ইসলাম স্যার। সাথের বেশিরভাগ বন্ধু-বান্ধবী হিসাব বিজ্ঞান বিষয়ে ভর্তি হওয়ার কারনে ৩ মাসের মাথায়ই আমাকে ব্যবস্থাপনা ছেড়ে হিসাব বিজ্ঞান বিষয়ে যেতে হলো। প্রথম অবস্থায় সিলেটর অলিগলি সব না চিনলেও করের পাড়া শ্রীহট্র সৎসঙ্গ বিহারে শুরু হয় সিলেটর অধ্যয়ন জীবন। প্রথম দিকে কাস লামা বাজার ক্যাম্পাসে শুরু হয়। ভালই লাগে জীবনের উচ্চ শিক্ষার নতুন বিদ্যাপীঠ। ছাত্র রাজনীতি এই শিক্ষা প্রতিষ্টানে খুবই সরগরম অবস্থান থাকলেও একটি ছাত্র সংগঠনে শুধু নাম লিখিয়ে দুরত্ব বজায় রেখেই চলতাম সব সময়। সাথের কয়েক সহপাঠী লামা বাজার ক্যাম্পাসের পাশে কলেজ হোষ্টেলে মাঝে মধ্যে আসা যাওয়া করতাম। এছাড়া রিকাবী বাজার পয়েন্টের আনোয়ারা রেষ্টুরেন্ট বসে আড্ডা মেরে অনেক সময় অতিক্রম করেছি। ফাষ্ট ইয়ার শেষ করার পূর্বেই আমাদের কমার্স ফ্যাকাল্টি আলাদা হওয়ার কারনে কাস পরিবর্তন হয়ে তারাপুর চা বাগানের পাশে অপরুপ সৌন্দর্য্যরে লীলাভুমি পাহাড়ী পরিবেশে গড়া উঠা রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পাশে তারাপুর কমার্স ফ্যাকাল্টিতে চলে যায়। সেখানে যেন সবুজের সমারোহ প্রকৃতির ছায়াঘেরা আরো নতুন পরিবেশ। কাসের ফাকেঁ গিয়ে পাহাড়ী পরিবেশে ঘুরতাম বন্ধু-বান্ধবী মিলে। মনে পরে আজও সেই সুকেশ, বিশ্বজিত, মিলন, অবিনাশ, প্রানেশ, ফরিদ, আরতি, শিল্পী, বীনা, জলি, ঝুমা সহ আরো অনেক বন্ধু-বান্ধবীদের কথা। যারা একসাথে তারাপুর নতুন ক্যাম্পাসে কাসের ফাকেঁ প্রায়ই চা বাগানের সুনিবিড় পরিবেশে বসে আড্ডা মারতাম। স্রোতের টানে সময় ও গড়িয়ে যায় । দেখতে দেখতে ২য় বর্ষ ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে ফেলি আমরা। সময় ২০০১ সালে ২০ শে ফ্রেব্রুয়ারীর কথা। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুব একটা ভাল নয়। প্রতিষ্টানের পক্ষ থেকে শিক্ষা সফর যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুকুল না হওয়ায় কারনে ৭ দিনের শিক্ষা সফর সংক্ষিপ্ত করে ৫ দিরে করা হয়েছে এমনকি কয়েকটা তারিখ ও পরিবর্তন করা হয়েছে। অবশেষে ৫ দিনের সংক্ষিপ্ত সফরে আমাদের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রদীপ কুমার দে সহ আরো কয়েকজন স্যারের নেতৃত্বে দর্শনীয় স্থান ভ্রমনের জন্য সিলেট থেকে ট্রেন যোগ রওয়ানা হই। সিলেট থেকে চট্টগ্রাম শহরে ভালভাবেই পৌছি। সেখানে চট্টগ্রাম,পতেঙ্গা, বায়েজীদ বোস্তামীর মাজার, জিয়া স্মৃতি জাদুঘর, ওয়ার সিমেট্রী পার্ক, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি শহর, ঝুলন্ত ব্রীজ, রাজবাড়ী বিহারসহ আরো অনেক ভ্রমন উপযোগী জায়গা ঘুরে দেখি। প্রথমে রাজনৈতিক পরিস্থিকে ভয় পেয়ে রওয়ানা হলেও আনন্দদায়ক ভ্রমনে রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারে নাই। শিক্ষা সফরে ঘুরে মনে হলো বাংলাদেশ যে এত অপরুপ সৌন্দর্য্যরে লীলাভুমি তা যেন এতদিন আমাদের অজানাতেই ছিল। সকলে মিলে সুস্থ ও হাসিখুৃশিভাবেই সকলে আবারও সিলেট ফিরে আসি। আনন্দদায়ক এই ভ্রমনে জীবনের অনেকটা নতুন মাত্রা যোগ হলো সেই শিক্ষা সফর। দেখতে দেখতে কিভাবে যে কেটে গেল মদন মোহন কলেজের অনার্স কোর্সটা তা যেন টেরই পাওয়া গেল না। অনার্স কোর্স শেষ করেই অনেক বন্ধু বান্ধবী প্রয়োজনের টানে অন্যান্য জায়গায় চলে যাওয়ার কারনে সেই দীর্ঘদিনের একটি বন্ধুত্বের বাধনে যেন কিছুটা ভাটা পড়ে গেল। পরবর্তীতে মাষ্টার্স কোর্স সেটা তো এক বছরের একটা ছোট কোর্স তাই খুব তাড়াতাড়ি যেন ছাত্রত্ব চলে যাওয়ার জন্য অবশেষে সেটা শেষ হয়ে গেল । যাই হোক ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্টান মদন মোহন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জীবনের ইতি টেনে যেন সকল বন্ধু-বান্ধব বাস্তব জীবনের তাগিদে যার যার মত করে সুবিধাজনক স্থানে ও কর্ম জীবনে মনোনিবেশের চেষ্টায় হুমড়ি খেয়ে বসল। কাংখিত শিক্ষা প্রতিষ্টান ছেড়ে চলে যেতে মন না চাইলেও কি আর ছাত্রত্ব ধরে রাখা যায়। তখন কবিগুরুর কথায় আবারো যেন সবাই সুর মিলাতে ইচ্ছা করছিল‘ যেতে নাহি দিব হায়,তবু যেতে দিতে হয়,তবু চলে যায়’ । ছাত্র জীবনের শুরু থেকে নজরুল ইসলাম স্যারকে প্রতিষ্টান প্রধান হিসাবে পেলে ও পরবর্তীতে আতাউর রহমান পীর স্যার,কৃপাসিন্ধু পাল স্যার এবং সর্বশেষ বর্তমানে যিনি প্রতিষ্টান প্রধান হিসাবে আসীন কলেজের সকল শিক্ষার্থীদের প্রিয় স্যার ড. আবুল ফহেত ফাত্তাহর আন্তরিক নেতৃত্বে এ শিক্ষা প্রতিষ্টানে শিক্ষার মান দিন দিন অগ্রগতি হয়ে চলছে। এছাড়া ঐতিহ্যবাহী সেই প্রতিষ্টান থেকে জ্ঞান অর্জন করে দেশের শীর্ষ পর্যায়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেৃতৃত্বদানকারী কত জ্ঞানীগুনী যে সমহিমায় প্রতিষ্টিত হয়েে শিক্ষা প্রতিষ্টানের অবদানকে আরো সমুন্নত করেছেন তার কোন ইয়াত্তা নেই। তাই আমি ও নিজিকে ধন্য মনে করছি যে লক্ষ্যে ও প্রত্যাশা নিয়ে প্রাণের সেই প্রিয় বিদ্যাপীঠে উচ্চ শিক্ষা অর্জন করতে পরিবার পরিজন ছেড়ে গিয়েছিলাম জ্ঞান আহরনের জন্য সেই ইচ্ছা আমার পূর্ন হয়েছে সঠিকভাবেই। কিন্তু তবুও যেন বার বার মনে হচ্ছে যে আরো কিছুদিন যদি সেখানে অধ্যয়ন করে কাটানো যেত তাহলে নিজেকে আরো বেশী সমৃদ্ধশালী মনে হতো। যাই হোক তবু ও জীবনে যতদিন বেচেঁ থাকা হবে ততোদিন সেই প্রতিষ্টানের স্মৃতিকে লালিত করব মনের অতল গহিনে মাধুরী মিশিয়ে এই হবে ভবিষৎ অঙ্গীকার। তবে আজকের যারা এ স্বনামধন্য প্রতিষ্টান এ বিভিন্ন বিভাগে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী তারা ও কালের আবর্তনে কদিন পর কোর্স শেষ করে চলে যেতে হবে। কিন্তু স্মৃতি তো আর ইচ্ছা করলেই মনের অতল গহিন থেকে ফেলতে পারবে না। কারন যে প্রতিষ্টান উচ্চ শিক্ষ দেয় যে প্রতিষ্টান জীবনের সঠিক পথের গতি দেখায় সে প্রতিষ্টানের প্রতিটি মুহুতই জীবনের অবিস্মরনীয় হয়ে থাকে। আজকের যারা শিক্ষার্থী,অভিভাবক ও জ্ঞানের আলো বিকশিতকারী শিক্ষক মন্ডলী রয়েছেন তারা যেন স্মৃতির সেই বিদ্যাপীঠকে অতীতের সুনাম ও ঐতিহ্যকে অনুসরন করে আরো সামনের দিকে নিয়ে যেতে পারেন সেই প্রত্যাশা থাকল নিরন্তর।
পরিশেষে এ শিক্ষা প্রতিষ্টানের প্রাক্তন শিক্ষার্থী,বর্তমান শিক্ষার্থী ও ভবিষৎতে যারা এ শিক্ষা প্রতিষ্টান থেকে জ্ঞান অর্জন করবেন এবং যারা শিক্ষার আলো ছড়াবেন তাদের সকলের উদ্দেশ্যে বলবঃ
‘যদি লক্ষ্য থাকে অটুট,বিশ্বাস হৃদয়ে,হবেই হবে দেখা,দেখা হবে বিজয়ে” ।

লেখকঃ
প্রভাষক হিসাব বিজ্ঞান(খন্ডকালীন)
প্রাক্তন ছাত্রঃ- বি,কম(অনার্স),এম,কম হিসাব বিজ্ঞান
মদন মোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ,সিলেট।
মোবাইলঃ-০১৭১২-৮৫১৮৫০
তারিখঃ ২১-০১-২০১৬ ইং
ইমেইলঃ uttampaulnabi@gmail.com

Pin It on Pinterest

Share This

By continuing to use the site, you agree to the use of cookies. more information

The cookie settings on this website are set to "allow cookies" to give you the best browsing experience possible. If you continue to use this website without changing your cookie settings or you click "Accept" below then you are consenting to this.

Close