ঘটক বুড়ো ও সিংহ : মোঃ শামীম মিয়া

imagesfffএক দেশে ছিলো এক রাজা । রাজাটা ছিলো অবিবাহিত । তাই তিনি তার রাজ্যে ঘোষনা দেন আমাকে যে ঘটক সুন্দরী একটা পাত্রী দিতে পারবে, তাকে আমি অনেক অর্থ দিবো। রাজার মুখে এমন কথা শুনে রাজ্যের ঘটকরা পাত্রী খুজতে উঠে পরে লাগেন। একদিন রাজ্যে হাজির হন হাজার হাজার পাত্রী । রাজা ঘুরে ঘুরে ভালো ভাবে দেখেন পছন্দ করেন একজন কে। পাত্রীটা এসেছে এই রাজ্যেরই মুনু বুড়ো ঘটকের হাত ধরে। ঠিক হয় রাজা আগামী কাল বিয়ে করবে এই মেয়ে কে। মুনু বুড়ো খুব খুশি হয়। কারণ রাজা তার খোঁজের পাত্রীকে পছন্দ করেছে। এবং আগামী কাল তাদের বিয়ে । ঘটক মুনু বুড়ো ভারি খুশি আনন্দ মনে গুন গুন করে গান গাইছে, আর মনে মনে বলছে, আমি এই রাজ্যের মধ্যে মোটামুটি ধনি হবো। রাজা অর্থ দিলে।
রাজা মুনু ঘটককে ডেকে বললো তোমাকে খুব ভোরে আসতে হবে আমি চাই তুমি সব সময় আমার সাথে থাকবে। মুনু ঘটক আরো খুশি হয়, মনে মনে বলে আমি সামান্য ঘটক থাকবো রাজার সাথে। কী মজা। মুনু ঘটক রাজ দরবার থেকে বিদায় নিয়ে নিজ বাড়িতে আসে। তার বঊকে সব বলে । আর বলে রাখে আজ আমাকে ফোজরের আযানের আগে ঘুম থেকে ডাক দিবি। তার বউ বলে ঠিক আছে। মুনু ঘটক ঘুমিয়ে যায়।
ফোজরের আযানের সময় ঘুম থেকে ডাক দেয় তার বউ। মুনু ঘটক হাত মুখ ধুয়ে নামাজ পড়ে, তারপর তাড়াহুড়া করে চলে রাজার বাড়ির দিকে। ঘটক মনে মনে বলে, বনের মধ্যে দিয়ে গেলে হয়তো অনেক সময় বাঁচবে। তাই ঘটক বনের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে রাজার বাড়ির দিকে। এমন সময় তার কানে ভেসে আসে কে গো তুমি ? আমাকে বাঁচাও। ঘটক সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেয় কে গো কোথায় আমাকে ডাকো ? ঘটক ডান দিকে তাকাতেই দেখে পুকুরের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে সিংহ। ঘটক বললো, কী গো বনের রাজা সিংহ তুমি কী করো এখানে। বনের পশু খাওয়া বাদ দিয়ে পুকুরের মাছ খাওয়া শুরু করেছো নাকী ? সিংহ বললো, ঘটক দাদু মজা করো না, আমি তিন দিন ধরে এখানে পরে আছি আমাকে বাঁচাও। ঘটক বললো, আমাকে বোকা পাইছো আমি তোমাকে বাঁচাবো, এই কথা ভাবলা কী করে। সিংহ বললো, আমি তোমাকে খাবো না। কথা দিলাম।
সিংহ ঘটককে অনেক অনুরোধ করলো। ঘটক মনে মনে বললো, সিংহ কে এই বিপদে ফেলে আমি যেতে পারিনা। তাই ঘটক সিংহকে বললো, তুমি সত্যি করে বলো, আমাকে খাবেনা তো ? সিংহ বললো, না, না আমি তোমাকে খাবো না, কথা দিলাম। ঘটক বললো, কথা বর খিলাব ব্যক্তিকে আল্লাহ কিন্তু পছন্দ করে না। মানুষও তাকে পছন্দ করে না। তুমি কথার বরখিলাব করবে না তো ? সিংহ বললো, না আমি কথা বর খিলাব করার পশু না। ঘটক অবশেষে, বনে থাকা একটা গাছের ডাল ভেঙ্গে সিংহকে ডালটা এগিয়ে দিলে সিংহ সেই ডাল ধরে পুকুর পারে আসে। ঘটক বললো, বনের রাজা সিংহ আমার কাজ শেষ আমি এবার যাই, রাজা আবার রাগ করবে। সিংহ বললো, ঘটক দাদু ঠিক বলেছো তোমার কাজ শেষ, তবে আমার কাজ সবে শুরু হলো। এবার আমি তোমাকে খাবো ঘটক দাদু। ঘটক ভয়ে কাঁপছে আর বলছে তুমি আমাকে খাবে মানে, আমাকে তো তুমি কথা দিয়েছো ? সিংহ বললো, তা ঠিক তবে আমার পেটের কী হবে ? আজ তিন দিন ধরে কিছু খেতে পাইনী দাদু তোমার শরীরটা তো বেশ ভালো মোটা তাজা তোমাকে খেলে পেটটা ভরে যাবে আরো পাবো অনেক মজা। ঘটক মনে মনে বললো, সর্বনাশ এই সিংহকে বাঁচিয়ে বড় বিপদে পড়লাম। এর হাত থেকে বাঁচতে হলে অভিনয় করতে হবে অনেক। তাই ঘটক বললো, আমি রাজি তুমি আমাকে মারো খাও যা ইচ্ছা তাই করো। তার আগে আমি চার জনকে বিচার দিবো, তারা যদি বলে তুমি ঠিক করেছো, আমাকে খেতে চেয়ে তাহলে তুমি আমাকে খেতে পারো। সিংহ অনেকক্ষন ভেবে বললো, ঠিক আছে চলো এবার আমরা সেই বিচারক দেড় খুজতে চলি। ঘটক বললো, ঠিক আছে চলো। এই বলে তারা চললো, বিচারকদের খোঁজে। কিছু দুর যেতেই ঘটক দেখতে পেলো তার মাথার উপড় দিয়ে উড়ে যাচ্ছে একটা কাক, কা, কা বলে। ঘটক বললো, ও কাক ভাই একটু দ্বাড়াও একটা বিচার করে যাও। একটা গাছের ডালে এসে বসে, এবং বলে ঘটক বলো কি বিচার করতে হবে ? ঘটক বললো, এই সিংহটা পুকুরের মধ্যে পরেছিলো আমি তাকে সেখান থেকে রক্ষা করি। তার আগে সিংহ আমাকে কথা দিয়েছিলো, আমাকে খাবে না, কিন্তু এখন সে আমাকে খেতে চাচ্ছে, এটা কী ঠিক করছে সিংহ ? কাক, কা, কা করে বললো, ঠিক করেছে সিংহ । ঘটক বললো, ঠিক করেছে মানে ? কাক বললো, ঘটক দাদু আমি কাক কি তোমাদের উপকার করি না বা রোগ বালাই থেকে তোমাদের রক্ষা করি না ? সেই উপকারের প্রতিদান তোমাদের তারা খাই। ঘটক বললো, তুমি কী বলতে চাচ্ছো ? কাক বললো, আমার বিচারে তোমাকে সিংহ খাবে এইটাই ঠিক। আমি চললাম। এই বলে কাক চলে যায়। ঘটকের মুখ ভয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে আর মনে মনে বলছে শয়তান কাক এইটা কেমন বিচার করলো। কাকের সাথে মানুষের তুলনা। সিংহ বলচ্ছে ঘটক দাদু আমি আর ক্ষুধা সহয্য করতে পারছি না গো। ঘটক বললো, সবে গেলো একজন আরো বাকি আছে তিনজন আগে তাদের বিচার দেখি ? সিংহ বললো, যা করবে তাড়াতাড়ি করো ? আমি আর ক্ষুধা সহয্য করতে পারছিনা। আর একটু দুরে গেলেই দেখা হয় বিড়ালের সাথে । ঘটক বিড়ালকে ডেকে বিচার দেয়,কাকের মতো। বিড়াল উত্তর দেয়, তোমাকে সিংহ খাবে এইটাই ঠিক। ঘটক দাদু তুমি একবার, আমি বিড়ালের কথাই ভাবো, আমি কী তোমাদের মানুষদের উপকার করিনা। অনেক উপকার করি,যেমন ধরো তোমরা মাছ খেয়ে কাটা ফেলে দাও, তা আমি খেয়ে ফেলি যাদে তোমাদের পায়ে কাটা না ফোটে। তাছাড়া তোমাদের ফসল যাতে ইদুরা খেতে না পারে সেজন্য উদুরকে খেয়ে ফেলি । এই টা কী তোমাদের উপকার করিনা। উপকার করি কিন্তু তার প্রতিদান, খাই তোমাদের লাঠির বারি নইলে তারা। আমার বিচারে সিংহ তোমাকে খাবে এইটাই ঠিক। এইটাই আমার বিচারের রায়। ঘটক দাদু এবার মুখটা মুছে নিলো আর মনে মনে বললো, রাজার বিয়ে বুঝি খাওয়া আমার কপালে নেই। সিংহর পেটে যাবো বুঝি আজ আমি। সিংহ বললো, ঘটক অযাথা দেরি করে লাভ নেই, তোমাকে খাওয়া শুরু করলাম। ঘটক বললো, দ্বারাও দ্বারাও আরো বাকি আছে। বাকিদের বিচারও যদি এমন হয়, তাহলে তো খাবেই আমাকে, আমি বাধা দিবো না। কিছুদুর যেতেই ঘটক দেখতে পেলো ছোট্ট পুকুরের ওপারে ঘাস খাচ্ছে একটা গরু। ঘটক তাকে বললো, ও গরু শুনতে পাচ্ছো কী ? গরু মাথাটা তুলে দেখে সিংহ কে, অমনী দৌড় দিতে চায়। ঘটক বলে তুমি নদীর ওপারে কেমনে যাবে সিংহ সেখানে। তুমি একটা বিচার করে দাও ওপার থেকে। গরু বলে কি বিচার করতে হবে বলো। ঘটক সব খুলে বলে গরুকে। গরু বললো, বুঝেছি উপকার করেছো, তার প্রতিদান ঘটক দাদু দিতে হচ্ছে, তোমাকে, তোমার অতি প্রিয় বস্তু প্রাণ। ঘটক মাথা নেড়ে বললো, হ্যাঁ ঠিক তাই। গরু হাঁসতে হাঁসতে বললো, ঘটক দাদু শেষ বেলায় তোমার দশা, আমার দশা এক। আমি কী মানুষের উপকার করিনা ? ঘটক বললো, হ্যাঁ উপকার করো। গরু কাঁদতে কাঁদতে বললো, আমি তো মানুষ কে দুধ দেই, মালামাল বহন করি,জমি চাষ করে দেই, শেষে আমার জীবন টা নিয়ে নেয় মানুষ আমার গোস্ত খায়। এমন কী আমার সন্তানদের ঠিক মত আমার দুধ খেতে দেয় না। আরো বলে ঘটক দাদু তোমাকে সিংহ খাবে এটাই ঠিক। ঘটক বললো, গরু তোকে ইচ্ছা করছে লাঠি পেটা করি। গরু বললো, দাদু সিংহর দিকে তাকাও আমার উপরের রাগ কমে যাবে। এই বলে দৌড়ে পালায় গরু। সিংহ বললো, ঘটক দাদু আর একজন আছে এই একজন এর বিচারও এমন হবে। চলো আড়লে সেখানে তোমাকে খাই ঘাবুস ঘুবুস করে। ঘটক কাঁদছে আর বলছে শয়তান সিংহ আমাকে তো খাবিই, তবে আমি শেষ বিচারকের বিচার দেখতে চাই। সিংহ বললো, ঠিক আছে আর মাত্র একজন তো, এতোক্ষন সহয্য করেছি, আর একটু করতে পারবো। তবে একটু জলদি করো। ঘটক কাঁদছে আর এগোচ্ছে। সিংহ গান গাইতে গাইতে এগোচ্ছে। এমন সময় দুরে একটা গাছের ডালে বসে আছে বানর, তাকে দেখতে পায়, ঘটক দাদু আর সিংহ। এবার সিংহ ডাক দিয়ে বললো, ও বানর ভাই শোন তো ? বানর বললো, সিংহ পাগল হয়েছো নাকী ? তুমি ডাকছো আর তোমার কাছে যাবো আমি ? সিংহ এবার অহংকার করে বললো, আমি বনের রাজা আর এসেছি এই বুড়োর জন্য সামান্য বানরের কাছে। এই কথা শুনে বানর কষ্ট পায়, কাউকে বুঝতে না দিয়ে বলে কি জন্য এসেছো। ঘটক বানর কে সব খুলে বলে । বানর বললো, ভাই আমি বিচার করতে পারি তবে আমি নিজ চোখে দেখতে চাই জায়গাটা, কোন পুকুরে সিংহ তুমি পড়েছিলে। সিংহ বললো, আমি বনের রাজা তোমাকে মিথ্যা বলছি ? বানর বললো, এখানে তুমি এখন কোন রাজা নও। আমি যা যা বলবো তা না শুনলে আমি বিচার করতে পারবো না। অন্য কোথাও যাও। সিংহ মনে মনে বললো, অন্য জনার কাছে যেতে অনেক সময় লাগবে। তার চাইতে বানর যা বলে তাই শুনি। অন্য কেউ তো দেখবে না। এখানে আমরা আছি তিন জন মাত্র। অবশেষে সিংহ বললো, ঠিক আছে তুমি যা বলবে আমি তাই শুনবো। তুবুও ঘটককে খাবো। বানর বললো, এবার লাইনে এলে। তাহলে শোনো আমি বলি, অন্যের কথায়, অন্যকে বকা দেওয়া যেমন বোকামী, নিজে সত্যটা না দেখে বিচার করা তেমনী। এবার চলো ঐ পুকুর পারে যেখানে তুমি পরেছিলে, তবে তুমি আর ঘটক আগে আগে যাবে। সিংহ বললো, চলো। ঘটক কাঁদছে আর চোখ মুচছে।
তারা এলো পুকুর পারে। সিংহ বললো, এই পুকুরের মাঝে পরেছিলাম। বানর বললো, বুঝচ্ছিনা তুমি যদি পুকুরে নেমে দেখাতে তাহলে তাড়াতাড়ি বিচার করতে পারতাম। সিংহ কথা না বাড়িয়ে পুকুরে নেমে গেলো। বানর বললো , ঠিক সেখানে যাবে যেখানে তুমি পরেছিলে। সিংহ কোন কথা না বাড়িয়ে সোজা চলে যায় সেখানে। এবার বানর বলে সিংহ দেখতো ওখান থেকে আসতে পারো কী না। সিংহ আর আসতে পারছেনা। বানর বললো, তুমি না বনের রাজা এবার পুকুর পারে এসো দেখি, শয়তান, বিশ্বাস ঘাতক এবার পানিতে ডুমে মর। তোকে এবার কে বাঁচাবে । সিংহ অবাক হয়ে বললো, কী বলো ভাই বানর । আমাকে বাঁচাও নইলে আমি তো মারা যাবো। বানর সিংহর দিকে কান না দিয়ে ঘটক মুনু বুড়োকে বললো, দাদু বানরের বাদরামী বুঝলা তো। দাদু এবার তুমি মুক্ত। তুমি রাজার বাড়ি যাও আমি আমার বাড়ি যাই। ঘটক তার চোখ দুটো মুছে বললো, বানর তোমাকে কোনদিন ভুলবো না। এই বলে দাদু চলে যায় রাজার বাড়ি, আর বানর চলে যায় তার বাড়ি। এদিকে সিংহ পানি খেতে খেতে ধিরে ধিরে চলে যায় পুকুরের তল দেশে। অবশেষে মারা যায় সিংহ টি। সমাপ্ত

Pin It on Pinterest

Share This

By continuing to use the site, you agree to the use of cookies. more information

The cookie settings on this website are set to "allow cookies" to give you the best browsing experience possible. If you continue to use this website without changing your cookie settings or you click "Accept" below then you are consenting to this.

Close