নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বন্ধুত্বই বাঁচাল সুনামগঞ্জের শামীমকে (ভিডিও)

Shamimসুরমা টাইমস ডেস্কঃ দীর্ঘ ৫০ দিন উত্তাল সাগরে ভাসতে ভাসতে যখন জানল কিছুক্ষণেরই মধ্যেই নিশ্চিত মৃত্যু, তখন বন্ধুত্বই নতুন জীবন দিল সুনামগঞ্জের শামীমকে। ‘যদি আমি বাঁচি তবে তুমিও বাঁচবে’ -শামীমকে দেওয়া কথা চরম প্রতিকূলতায়ও ভুলে যাননি নুরুল হোসেন।
নিজের জীবন বিপন্ন জেনেও বন্ধুকে বাঁচাতে জলে ঝাঁপ দিয়েছেন এ তরুণ। বন্ধুর কাঁধে ভর দিয়ে ‘নতুন জীবন’ পেয়েছেন শামীম।
অবৈধ পথে মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য ট্রলারে উঠেছিলেন ১৮০ জন নারী-পুরুষ। ১৪০ জন বাংলাদেশি, আর ৪০ জন রোহিঙ্গা। এঁদেরই একজন ছিলেন সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নের জগাইরগাঁও গ্রামের খলিলুর রহমানের ছেলে শামীম আহমেদ। কয়েকদিন আগে তিনি নিজ বাড়িতে ফিরেছেন। শোনালেন নিজের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা।
শামীম বলেন, ট্রলারে থাকাকালে প্রত্যেককে দেওয়া হতো একমুঠ করে ভাত, সাথে দুটি লাল মরিচ। এভাবে তাঁরা দিনের পর দিন সাগরে ভাসছিলেন। হঠাৎ থাইল্যান্ডের ট্রলার মালিক ক্যাপ্টেনকে নির্দেশ দিলেন ১৮০ জনসহ ট্রলারটি সাগরে ডুবিয়ে দিতে। কারণ হিসেবে মালিক বলেন, এই জাহাজের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। যদি জাহাজটি মিয়ানমারের পুলিশ আটক করে, তাহলে জাহাজ মালিককে এর জন্য আটক করা হতে পারে। থাইল্যান্ডের ক্যাপ্টেন দুজন ভালো মানুষ হওয়ায় তাঁরা বাংলাদেশি দালালদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন যাতে বাংলাদেশি ১৪০ জনকে তারা ফিরিয়ে নেন। কিন্তু বাংলাদেশি দালালরাও ক্যাপ্টেনকে বলেন, যাতে ট্রলারটি ডুবিয়ে দেওয়া হয়। বাংলাদেশেও নাকি এ নিয়ে ঝামেলা হচ্ছে। এদের ফিরিয়ে নিতে গেলে নিজেরাই ধরা পড়ে যাবে।
কথা বলতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলছিলেন শামীম, অনুরোধে আবার শুরু করলেন, ‘ডুবিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে নিতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে আসছিল। সন্ধ্যা হওয়ার সাথে সাথে জাহাজের তিনটি বাতি জ্বালানো হলেও পরে দুটি বাতি নিভিয়ে ফেলা হয়েছিল। যাতে ট্রলারটি অন্য কোনো জাহাজের নজরে না আসে। আর এ নিয়ে সবার মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। কারণ যেকোনো সময়ই ট্রলার ডুবিয়ে দেওয়া হবে। ভেতরে সবাই ছুটোছুটি করতে লাগলেন। ক্যাপ্টেনের হাতে-পায়ে ধরে পড়ে থাকলেন সবাই। পরে জাহাজের ক্যাপ্টেন সবার উদ্দেশে ঘোষণা দিলেন, যদি কোনো মাছ ধরার নৌকা দেখেন, তাহলে যেন সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়েন। যদি মাছ ধরার ট্রলারের জেলেদের মনে দয়া হয়, তাহলে তারা তাদের ট্রলারে আমাদের তুলে নিতেও পারে। এ দিকে রাত যতই গভীর হচ্ছিল জাহাজে সবার মধ্যে আতঙ্ক বেড়েই যাচ্ছে। কখন কী হয় ঠিক বুঝা যাচ্ছিল না।’
ট্রলার ডুবিয়ে দেওয়ার নির্দেশ
হঠাৎ ট্রলারে একটা ফোন এলো, জাহাজে থাকা একজনকে বাঁচাতে হবে। কারণ এই একজন চট্টগ্রামের কোনো এক দালালের ভাতিজা। পরে দালালদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, চিটাগাং বিভাগের ৪০ জনের সবাইকেই বাঁচাতে হবে।
তাদের বাঁচাতে মাছ ধরার ট্রলারে উঠিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর চট্টগ্রাম বিভাগ ছাড়া বাকিদের সাগরে ডুবিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।’
ট্রলারে থাকার সময় চিটাগাং বিভাগের কক্সবাজার জেলার সিকদারপাড়া ইউনিয়নের নুরুল হোসেনের সঙ্গে শামীমের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। শামীম বলেন, এই কদিনে আমার সাথে তাঁর খুব ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। তবে চিটাগাংয়ের লোকদের বাঁচাতে এত কিছু যে ঘটে যাচ্ছিল, তা অন্য কেউ জানত না। জানলে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়তে পারে, এই আশঙ্কাও করা হচ্ছিল। পরে নুরুল হোসেন আমাকে এসে বলছিল, শুধু চিটাগাং বিভাগের সবাই বাঁচবে, আর বাকিদের মেরে ফেলা হবে। তার কথা শুনেই আমি হাউ মাউ করে কেঁদে উঠি। সাথে সাথে তাঁর পায়ে ধরে বলি, তুমি না আমার দোস্ত, তুমি আমারেও তোমার সাথে চিটাগাংয়ের বলে বাঁচাও না বন্ধু। তখন নুরুল হোসেন অনেকক্ষণ চিন্তা করে বলল, যাও বন্ধু কথা দিলাম যদি আমি বাঁচি, তাহলে তুমিও বাঁচবে।’
‘তাঁর কথা শুনে অবশ্য বিশ্বাস হচ্ছিল না। কারণ জাহাজের অন্য দালালরা জানে আমি সুনামগঞ্জের। এরই মধ্যে জাহাজের ক্যাপ্টেন কিছু মাছ ধরার ট্রলারের পিছু নিয়েছেন। তবে ট্রলারগুলো আরো গতিতে ছুটছিল তাই মাছ ধরার কোনো ট্রলার ধরা যাচ্ছিল না। নুরুল এর পর থেকে আমাকে তার সাথে সাথে থাকতে বলে, আর আমিও তার সাথে সাথেই থাকলাম।’
‘এদিকে ট্রলারে চিটাগাংয়ের ৪০ জন ছাড়া সবাইকে পানির সাথে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করে রাখা হয়। ঘুমের ওষুধ না খাওয়ালে পরে কেউ কাউকে ট্রলারে উঠতে দিত না। এ নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতো। এরই মধ্যে জাহাজটি একটি ট্রলারের পিছু নিয়ে ট্রলারকে ধরতে পেরেছে। সবাই সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়ছিল, যখন আমি ঝাঁপ দিতে যাই, তখন আমাকে পিছন থেকে দালালদের একজন আটকে রাখে। অন্যদিকে আমার বন্ধু নুরুল সামনের দিক থেকে আমাকে টেনে ধরে রাখে। নুরুল দালালদের বলছিল, আমিও টিচাগাংয়ের। দালালদের সে অনুরোধ করছিল, আর আমাকে সামনের দিকে টানছিল। একসময় আমি দালালের কাছে শার্ট ছিঁড়ে রেখে ট্রলারে ঝাঁপিয়ে পড়ি,’ বলেন শামীম।
কথাগুলো বলার সময় বারবারই কথা আটকে যাচ্ছিল শামীমের। ঘর থেকে তাঁর বাবা ও বড় ভাই তাঁকে ধরে নিয়ে এসেছিলেন উঠানে, মাছ ধরার ট্রলারে ঝাঁপিয়ে পড়ার সময় পায়ে ব্যথা পেয়ে এখনো একা একা হাঁটতে পারেন না তিনি। ট্রলারের বাকিদের কী হয়েছে তা-ও তাঁর জানা নেই।
শামীম বলে চলেন, ‘সুনামগঞ্জ সদরের গৌরারং ইউনিয়নের পুরান গৌরারং গ্রামের আবদুল মজিদের ছেলে আছদ্দর আলীর সাথে পরিচয় ছিল অনেক আগে থেকেই। সে প্রায়ই আমাকে জাহাজে করে মালয়েশিয়া যাওয়ার কথা বলত।
প্রথম প্রথম আমি তেমন পাত্তা দিতাম না। একসময় আমারও মনে হলো দেশে থেকে আর কীই বা করতে পারি। আমরা চার ভাই, তিন বোন। ভাইদের মধ্যে আমি সবার বড়। একদিন না একদিন পরিবারের হাল আমাকেই ধরতে হবে।
তাই ভাবলাম মালয়েশিয়া যেতে পারলে আমার পরিবারের সবাই একটু সুখে থাকতে পারবে। পরে তাঁর কথায় রাজি হয়ে গেলাম। কথা ছিল মালয়েশিয়া গিয়ে পৌঁছালে তাকে এক লাখ ৮৫ হাজার টাকা দিতে হবে। আমি রাজি হয়ে আছদ্দর আলীকে নগদ পাঁচ হাজার টাকা দিই। আছদ্দর আলী চিটাগাং বন্দরে নিয়ে গিয়ে আমাকে একটি জাহাজে তুলে দেয়। এরপর ৪৭ দিন এই সাগর থেকে ওই সাগরে জাহাজে জাহাজে ঘুরলাম। কোনো কূল নাই, কিনারা নাই। বেঁচে ফিরতে পারব কি না তাও জানতাম না। শুধু আল্লাহর কাছে দোয়া করতাম, হে আল্লাহ তুমি আমাকে আমার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে নাও। চোখ বন্ধ করলেই মা-বাবার মুখ চোখে ভেসে উঠত সামনে। তখন আরো কাঁদতাম,’ বলেন শামীম।
ফিরে আসা
আবার শুরু করেন, ‘যাক সবকিছুর পরে ট্রলারে ওঠার দুই দিন পর ১১ মে টেকনাফের কাছাকাছি পৌঁছালাম। ট্রলার থেকে সবাই লাঠি দিয়ে পিটিয়ে বুক পানিতে নামিয়ে দিয়ে যায় ট্রলারটি। আমি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। দালালের টানাটানির সময় আমার পায়ে ব্যথা পাই। তারপরও বুকপানিতে পড়ে হামাগুড়ি দিয়ে কিছুটা তীরে আসতে পারলেও ঠিকমতো যেতে পারছিলাম না। পরে একসময় মনে হয় হয়তো মারা যাব, বেঁচে ফিরতে পারব না। আবারও পরিবারের সবার ছবি চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। তাকিয়ে দেখি সবাই আমাকে ফেলে চলে যাচ্ছে। এরপর ৩০-৪০ মিনিট পরে আমার বন্ধু নুরুল হোসেন ফিরে আসে। নুরুল আমাকে বলে, যেই সে পাড়ে ফিরে গেছে পেছন ফিরে দেখে আমি নাই, তাই আমার জন্য আবার এক থেকে দেড় মাইল পথ দৌড়ে পানিতে ফিরে এসেছে। তাঁকে জড়িয়ে ধরে আবারও হাউমাউ করে কেঁদেছিলাম। বন্ধু সত্যিই তার কথা রেখেছে। তার সাথে আমাকেও জীবিত নিয়ে এসেছে। তার কাঁধে করে তীর পর্যন্ত আমাকে নিয়ে আসে।’
‘পরে টেকনাফ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) আমাদের সবাইকে ক্যাম্পে নিয়ে যায়। ১৩ মে আইনি জটিলতা শেষে আমাকে ছেড়ে দেয়। আমি বাড়িতে ফিরে এসে বেহেশতের সুখ অনুভব করছিলাম। আমার বন্ধুর কথা বারবার মনে হচ্ছিল,’ বলেন শামীম। শামীম আহমেদের অভিজ্ঞতা শোনার পর তাঁর বন্ধু নুরুল হোসেনের সাথে ফোনে যোগাযোগ করা হয়।
অপর পাশ থেকে নুরুল হোসেন ফোন ধরলে তাঁর কাছে সুনামগঞ্জের শামীম আহমেদের পরিচয় দিয়ে প্রশ্ন করা হয়, শামীম বলছিলেন যে, আপনি তাঁর জীবন বাঁচিয়েছেন। কিছুক্ষণ নুরুল হোসেন কোনো কথা বলেননি। পরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘শামীমের সাথে জাহাজে থাকার সময় অনেক দুঃখ, কষ্টের কথা বলেছি। সেও বলেছে। অনেকদিন একসাথে থাকতে থাকতে একটা ভালো বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। আমরা দুজন খাবারও ভাগাভাগি করে খেতাম।
একসময় যখন দেখলাম, আমরা চিটাগাং বিভাগের লোকেরাই শুধু বাঁচব, তখন বন্ধু শামীমের জন্য খুব কষ্ট লাগছিল, পরে একটু কায়দা করে দালালদের বলি শামীমও চিটাগাং বিভাগের। একসময় দালালের কাছ থেকে তাকে টেনে নিয়ে ট্রলারে উঠি। পরে যখন ট্রলার থেকে নেমেছি, তখন নিজের নতুন জীবন ফিরে পেয়ে বন্ধুর কথা ভুলে গিয়ে তীরে উঠি। যখন শামীমের কথা মনে হলো, তখন পেছনে তাকিয়ে দেখি শামীম নেই। তাই আবার ওইখানে ফিরে গিয়ে শামীমকে নিয়ে আসি।’
নুরুল হোসেন আরো বলেন, ‘খুব শিগগির শামীমের সাথে দেখা হবে। সাগরে থাকার সময় বলেছিলাম যদি বেঁচে থাকি, তাহলে দুই বন্ধু এক সাথে শাহজালাল (রহ.) মাজার জিয়ারত করতে যাব।’

Pin It on Pinterest

Share This

By continuing to use the site, you agree to the use of cookies. more information

The cookie settings on this website are set to "allow cookies" to give you the best browsing experience possible. If you continue to use this website without changing your cookie settings or you click "Accept" below then you are consenting to this.

Close