ফের সংলাপের উদ্যোগ জাতিসংঘের : আ’লীগ ও বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সাথে যোগাযোগ

প্রেস ব্রিফিং এ বার বার বাংলাদেশ নিয়ে প্রশ্ন

tarancoনিউইয়র্ক থেকে এনা : বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘ অব্যাহতভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করছে। জাতিসংঘের প্রতি দিনের প্রেস ব্রিফিং এ বাংলাদেশ প্রসঙ্গ নিয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করছেন এবং জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের প্রতিনিধি স্টিফেন ডোজারিক সেই প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন এবং জাতিসংঘের অবস্থান ব্যাখ্যা করছেন। এ দিকে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে গত ১১ এবং ১২ ফেব্রুয়ারি স্টিফেন ডোজারিক সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, বাংলাদেশ বিষয়ে জাতিসংঘ ওয়াকিবহল রয়েছে এবং তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার খাবার রেখে দেয়ার বিষয়টিও তারা জানে। শুধু উদ্বেগ প্রকাশই করেনি বাংলাদেশের স্থিতিশীলতায় জাতিসংঘের মহাসচিব প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও তিনি জানান। গত ১২ ফেব্রুয়ারির প্রেস ব্রিফিং এ স্টিফেন সাংবাদিকদের জানান, বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়ালের সাথে সাক্ষাত করেছেন জাতিসংঘের সহকারি মহাসচিব অস্কার ফার্নন্ডেজ তারানাকো। নিশা দেশাই বিসওয়ালের সাথে তারানাকোর কি কথা হয়েছে, এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কি কথা হয়েছে সে বিষয়ে আমি অবগত নই। তবে এ কথা বলতে পারি যে বাংলাদেশের বর্তমান অচলাবস্থা নিরশনে আমেরিকা এবং জাতিসংঘ এক সাথে কাজ করবে। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের সংকট নিরসনে তারানাকোকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রায় এক মাসের অধিক সময় ধরে বাংলাদেশে বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটের আহবানে সারা দেশে অবরোধ এবং হরতাল চলে আসছে। এই অবরোধ এবং হরতালে সারা বাংলাদেশের জন জীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। ব্যবসা- বাণিজ্য প্রায় শূণ্যের কোঠায়। জন মনে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার বিএনপি এবং ২০ দলীয় জোটের আন্দোলন কর্মসূচিকে কোন গুরুত্বই দিতে চাচ্ছেন না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং শীর্ষ স্থানীয় মন্ত্রী এবং নেতাদের মুখের কথায় প্রমাণ মিলে না যে- সরকার বিএনপির আন্দোলনে শঙ্কিত। কিন্তু সরকারের কর্মকান্ডেই প্রমাণ করে তারা মুখে যা বলছেন বাস্তবের সাথে তার অনেক ফারাক। সরকার যদি বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের আন্দোলনে শঙ্কিত না হোত তাহলে রাষ্ট্রের আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে গুলি করার নির্দেশ দিতো না এবং আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধানদের দিয়ে জন সভা করিয়ে এভাবে মানুষকে গুলি করার হুমকি দিতো না। সারা দেশে পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব এবং সীমান্তে থাকা বিজিবিকে উঠিয়ে এনে সারা দিশে নিয়োগ দিতো না। আবার সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার উপর মানসিকভাবে চাপ সৃষ্টি করার জন্য তার গুলশান কার্যালয়ের বিদ্যুৎ লাইন, পানির লাইন, গ্যাস লাইন, ইন্টারনেট সংযোগ, টেলিফোন লাইন কেটে দিয়ে তাকে গৃহবন্দী করে রাখতো না। আন্দোলনকারী মানুষ যেভাবে রাজধানী ঢাকাকে সারা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে ঠিক তেমনিভাবে সরকারও বেগম খালেদা জিয়াকে সারা দেশ নয়, সারা বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। সূত্র জানায়, সরকার ভয় পাচ্ছে বলেই এই সব কর্মকান্ড করছেন এবং বিএনপির শীর্ষ নেতাদের একের পর এক গ্রেফতার করছেন। এই গ্রেফতার শুধু ঢাকা কেন্দ্রিক নয়, পুরো বাংলাদেশেই গণহারে বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। মাঝে মাঝে মধ্যে কোন কোন মন্ত্রী যারা সংলাপের কথাই সহ্য করতে পারতেন না, তারাই এখন বলছেন, অবরোধ বা আন্দোলন বন্ধ করলে সংলাপ হতে পারে। সরকার যে বিচলিত তার প্রমাণ মিলে মন্ত্রীরা এখন বলেন, আইন- শৃঙ্খলা বাহিনী ব্যর্থ হয়েছে। বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের এই আন্দোলন দমানের জন্য সরকার সময় নিয়েছিলো মাত্র ১ সপ্তাহ কিন্তু আজ এক মাসের বেশি হলেও কার্যত সরকার রাজধানী ছাড়া দেশের ৬৪টি জেলাতেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে।
বাংলাদেশের ভয়ঙ্কর এবং আতঙ্কিত এই পরিস্থিতিতে ইতিমধ্যেই আমেরিকা, ব্রিটিন, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অধিকাংশ দেশই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। উদ্বেগ প্রকাশ করেছে খোদ জাতিসংঘও। বাংলাদেশের বর্তমান সহিংস অবস্থা নিরসনে এবং সকল দলের অংশগ্রহণের একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য জাতিসংঘ ফের সংলাপের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। জাতিসংঘের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, ইতিমধ্যে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির শীর্ষ স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সাথে সংলাপের বিষয় নিয়ে তাদের মতামত চাওয়া হয়েছে। উভয় দল সম্মতি হলেই জাতিসংঘ সংলাপ আহবান করবেন। ঐ কর্মকর্তা জানান, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পূর্বেও জাতিসংঘ সংলাপের চেষ্টা করেছিলো এবং সকল দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের চেষ্টা করে আসছিলো। মূলত: জাতিসংঘের কর্মকর্তা তারানাকোর নেতৃত্বে সেই কমিটিই দুই সপ্তাহ আগ থেকে কাজ করেছে। ইতিমধ্যেই আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে। সেই সাথে সুশীল সমাজের লোকজনের সাথেও যোগাযোগ করা হয়েছে। ঐ সূত্র জানায়, জাতিসংঘ মাঠে নেমেছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সাথে সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতার করার। জাতিসংঘের লক্ষ্য দুই দলের শীর্ষ নেতাদের একই টেবিলে বসানো। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের নির্দেশেই বিশেষ দলটি একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য কাজ করছে। কীভাবে যোগাযোগ করা হচ্ছে- এই প্রশ্নের জবাবে ঐ শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, কখনো টেলিফোনে আবার ঢাকাস্থ জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে। সূত্র জানায়, বাংলাদেশে বর্তমানে যেভাবে মানবাধিকার লংঘন করা হচ্ছে, তাতে জাতিসংঘ উদ্বিগ্ন। তারা চান না মাসের পর মাস এই সহিংসতা বাংলাদেশে চলতে থাকুক। সরকার আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লংঘন করুক। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকারকে অবশ্যই বিরোধী দলের মত প্রকাশের স্বাধীনতা দেয়া উচিত, সভা- সমাবেশ করতে দেয়া উচিত। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশের আইন শৃঙ্খলা বাহিনী যদি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লংঘন করে তাহলে আগামীতে জাতিসংঘের শান্তি রক্ষী মিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ প্রশ্নের সম্মুখীন হতে পারে। এই সংক্রান্ত স্টেটমেন্ট জাতিসংঘ ২২ জানুয়ারি প্রকাশ করেছিলো।
জাতিসংঘের ঐ শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, মূলত: আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির সাড়ার উপরই নির্ভর করছে তাদের সংলাপের ভবিষ্যত। তিনি বলেন, আমরা আশা করছি, আমাদের সংলপের যে আহবান তাতে সাড়া দিবেন উভয় দল। আরেকটি সূত্রে জানা গেছে, জাতিসংঘের আহবানে বিএনপি সাড়া দিলেও আওয়ামী লীগ সাড়া নাও দিতে পারে। তবে জাতিসংঘ সংলাপের ব্যাপারে শেষ চেষ্টা চালিয়ে যাবে। সূত্র মতে আওয়ামী লীগ জাতিসংঘের আহবানে ডাকা না দিলেও দ্বিতীয় পর্যায়ে জাতিসংঘের প্রতিনিধির বাংলাদেশ সফরের সম্ভাবনা রয়েছে। জাতিসংঘের কর্মকর্তারা আশাবাদী যে, সরকার তাদের আহবানে সাড়া দিবে এবং সংকট দূর হবে। সরকার যদি জাতিসংঘের আহবানে সাড়া না দেয় তাহলে জাতিসংঘের পদক্ষেপ কী পারে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা আশাবাদী সরকার সাড়া দেবে এবং সংলাপ শুরু হলে সমাধানও হবে। আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন শীর্ষ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ জাতিসংঘের সংলাপের আহবানে সাড়া দিয়েছেন। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মালিক হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি যদি সরকার সাড়া না দেয় তাহলে পরিস্থিতি অনুযায়ীই জাতিসংঘ পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। উল্লেখ্য এই রিপোর্টটি নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত ঠিকানায় চলতি সপ্তাহে লিড নিউজ হিসাবে প্রকাশিত হয়েছে।

Pin It on Pinterest

Share This

By continuing to use the site, you agree to the use of cookies. more information

The cookie settings on this website are set to "allow cookies" to give you the best browsing experience possible. If you continue to use this website without changing your cookie settings or you click "Accept" below then you are consenting to this.

Close