রাগীব আলীর অবৈধ রাজ্যে বিনিয়োগকারীরা বিপদে

4_16760-copyডেস্ক রিপোর্ট :: সিলেটে চা বাগানের জমিতে গড়ে ওঠা বহুতল আবাসিক ভবন জালজালিয়াতির মাধ্যমে অন্যের সম্পত্তি দখল করে তারাপুরে বিশাল ‘রাজ্য’ গড়ে তুলেছিলেন কথিত ‘দানবীর’ রাগীব আলী। চা বাগান ধ্বংস করে তাতে গড়েছিলেন বহুতল ভবন, মার্কেট, কমিউনিটি সেন্টার, ছাত্রাবাস। বিক্রি করেছিলেন প্লট। এসবে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন বড়-ছোট বহু ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ। গড়েছিলেন আবাস, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এখন চরম বিপদে পড়েছেন তারা। সব হারানোর শংকায় নির্ঘুম দিন কাটছে তাদের।

সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ রায় দিয়েছেন, রাগীব আলী ও তার ছেলে আবদুল হাই কিংবা তার পক্ষের কেউ তারাপুর চা বাগানের মালিক নন। এখানকার সব স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হবে, গড়তে হবে সবুজ শ্যামল চা-বাগান। এ রায়ের পর থেকেই বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ রায়ের বাস্তবায়ন দেখার আশায় রয়েছেন। তবে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে অবৈধ এ সাম্রাজ্যের বাসিন্দাদের মধ্যে। উচ্ছেদ আতংকে রয়েছেন তারা।

রোববার তারাপুর চা বাগানে গিয়ে বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বললে তাতেও উঠে আসে এ উদ্বেগ-আতংক। উচ্চ আদালতের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তারা বলেন, রায় বাস্তবায়ন হলে শত শত ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সহস্রাধিক মানুষ বেকার হয়ে যাবে। আদালত সব স্থাপনা সরানোর নির্দেশ দিলেও ব্যবসায়ীদের ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনায় নেননি। তবে এমন ক্ষতির জন্য তারা রাগীব আলীকেই দায়ী করেছেন। তারা বলছেন, তাকে বিশ্বাস করেই আজ সর্বস্বান্ত হতে বসেছেন তারা। ২০১১ সালের সদর উপজেলা ভূমি অফিসের তদন্ত প্রতিবেদন মতে, বিভিন্ন ব্যক্তির জমি দেখিয়ে ৭ মৌজায় তারাপুর চা-বাগানের ভূমিতে ৩৩৭টি প্লট বিক্রি করেন রাগীব আলী ও তার সহযোগীরা। যাদের কাছ থেকে এসব জমি কেনা দেখিয়েছেন তাদের মধ্যে কয়েকজন হলেন- গোপাল ঘোষ, প্রদীপ কুমার ঘোষ, গোপেষ ঘোষ, আবদুল হাই চৌধুরী, ঈশান চন্দ ঘোষ, গিয়াস উদ্দিন আহমদ, আবদুল মুছব্বির, জৈতুন্নেছা, নূর-ই এলাহি, আবদুর রহমান, আবদুল লতিফ, খালিদ চৌধুরী, পঙ্কজ কুমার দত্ত, নুনু মিয়া, তারা মিয়া, লাল মিয়া, সুরুজ খান, সৈয়দ আলীর ছেলে, মমতাজ আলী, কালাই মিয়া, পুলক কবির, আতাউর, আবদুল রশিদ, ছাদ, হাফিজ আবু নসর, গউছ উদ্দিন চৌধুরী, সৈয়দ মোজাফফর আলী, শরীফ চৌধুরী, শামসুন নেছা খানম, রাধা লাল গুপ্ত, মুহিদুর রহমান, কাপ্তান মিয়া, আবদুল হাই। অভিযোগ রয়েছে, সিলেটের জালজালিয়াতির কারিগর রাগীব আলী তার ঘনিষ্ঠ এসব মানুষকে বিভিন্নভাবে মালিক সাজিয়ে তাদের মাধ্যমে অন্যের কাছে বিক্রি করে কয়েকশ’ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। ৭টি মৌজার মধ্যে তারাপুর টি গার্ডেন মৌজার জেএল নং ৭৬-এ রয়েছে ২২৫টি প্লট। আঙ্গাউড়া মৌজার জেএল নং ৫২-এ রয়েছে ৭০টি প্লট। মিউনিসিপ্যালিটি মৌজার জেএল নং ৯১-এ রয়েছে ১২টি প্লট। কুমারগাঁও মৌজার জেএল নং ৮০-এ রয়েছে ১০টি। ব্রাহ্মণশাসন মৌজার জেএল নং ৭৮-এ রয়েছে ১৯টি প্লট।

এভাবে জালজালিয়াতির মাধ্যমে রাগীব আলী তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় দেওয়ান মোস্তাক মজিদকে সেবায়েত সাজিয়ে হিন্দু মন্দিরের ২ হাজার কোটি টাকার ভূমি হাতিয়ে নেন। এসব ভূমি অপদখল নিয়ে বিভিন্ন সময় আদালতে ৫৩টি মামলা করা হয়। এর মধ্যে ২০০৫ সালে সদর উপজেলার তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) এসএম আবদুল কাদের বাদী হয়ে এ ভূমি উদ্ধারের লক্ষ্যে কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা করেন। পরে মামলাটি উচ্চ আদালতে স্থগিত করে রাখেন রাগীব আলী।

মামলায় উল্লেখ করা হয়, শ্রী শ্রী রাধাকৃষ্ণ দেবতার সেবায়েত সেজে মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার বালিদীঘির পারের আবদুল ওয়াছের পুত্র দেওয়ান মোস্তাক মজিদ রাগীব আলীর পুত্র আবদুল হাইকে চা বাগানটি ৯৯ বছরের জন্য লিজ দেন।

এজাহারে বলা হয়েছে, রেকর্ড পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয়, মন্দিরের তৎকালীন সেবায়েত পঙ্কজ কুমার গুপ্তকে ম্যানেজ করে রাগীব আলী, তার স্ত্রী, পুত্র, কন্যাসহ ৭ জন মিলে এই মূল্যবান ভূসম্পত্তি আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে একে অন্যের যোগসাজশে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অনুমতিপত্র জাল করে। এতদিন ধামাচাপা দিয়ে রাখলেও সম্প্রতি সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ এ মামলাটি সচল করার নির্দেশ দেন এবং দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি করার জন্য মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটকে নির্দেশনা প্রদান করেন। তবে কোতোয়ালি থানার ওসি সুহেল আহমদ জানান, রোববার পর্যন্ত তিনি ওই রায়ের কোনো কপি পাননি। পেলে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে কেন্দ করে গড়ে ওঠা ব্যবসায়ী ও প্লট মালিকরা রয়েছেন উচ্ছেদ আতংকে। হাসপাতালের উত্তর গেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রঞ্জিত কুমার চৌধুরী আদালতের রায়কে শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, রায় হয়েছে, আমরা পরবর্তী পদক্ষেপের অপেক্ষায় আছি। সাধারণ সম্পাদক খালেদ মিয়া উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, উচ্চ আদালতের রায় যদি বাস্তবায়ন করা হয় তাহলে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বেকার হয়ে পড়বে সহস্রাধিক মানুষ। দক্ষিণ গেট বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদুর রহমান খান ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দারা আতংকে আছেন বলে উল্লেখ করলেও বেশি কিছু বলতে রাজি হননি। তারাপুর চা বাগানের মতিন টাওয়ারের মালিক আবুল মনছুর টিপু তার টাওয়ারটি চা বাগানের নয় দাবি করে বলেন, ভবনটি তার মায়ের কাবিনের জায়গার ওপর নির্মিত।–যুগান্তর

Pin It on Pinterest

Share This

By continuing to use the site, you agree to the use of cookies. more information

The cookie settings on this website are set to "allow cookies" to give you the best browsing experience possible. If you continue to use this website without changing your cookie settings or you click "Accept" below then you are consenting to this.

Close