শোক ও গৌরবের অমর একুশে আজ

21.02.2015ছামির মাহমুদঃ শোকে বিহ্বল, গৌরবে দীপ্ত এক অনন্য দিন আজ বাঙালির জীবনে। ইতিহাসের দীর্ঘ পথ-পরিক্রমায় প্রথমবার মানুষ মায়ের ভাষার অধিকার রক্ষায় বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছিল রাজপথে। সেই মানুষের পরিচয় বাঙালি। আজ থেকে ৬৩ বছর আগের এই দিনটি ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি। ঢাকার রাজপথ হয়ে উঠেছিল উত্তাল। পাকিস্তানি শাসকদের হুমকি-ধমকি, রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ১৪৪ ধারা ভেঙে মাতৃভাষার মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে পথে নেমে এসেছে ছাত্র, শিক্ষক, শিশু-কিশোরসহ নানা বয়সী অসংখ্য মানুষ। বসন্তের আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে তারা ব্রনির্ঘোষ কণ্ঠে আওয়াজ তুলেছে, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। পলাশে-শিমুলে রক্তিম হয়ে আছে বাংলার দিগন্ত। গুলি চালানো হলো মিছিলে। সালাম, বরকত, রফিক, শফিক, জব্বারসহ বাংলা মায়ের অকুতোভয় সন্তানদের তাজা রক্তে রঞ্জিত হলো দেশের মাটি। এক অভূতপূর্ব অধ্যায় সংযোজিত হলো মানব ইতিহাসে। অমর একুশের পথ ধরেই উন্মেষ ঘটেছিল বাঙালির স্বাধিকার চেতনার। সেই আন্দোলনের সফল পরিণতি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন। ভাষার জন্য বাঙালির এই আত্মদানের দিনটিকে ১৯৯৯ সালে ইউনেসকো ঘোষণা দিয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। বাঙালির সঙ্গে সারা বিশ্ববাসী আজ দিনটি পালন করবে মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা ও গৌরব বুকে নিয়ে।
দিবসটি উপলক্ষে সিলেট আওয়ামী লীগ, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, সম্মিলিত নাট্য পরিষদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে রাত ১২টা ০১মিনিটে সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ, সকাল ৬টায় প্রভাত ফেরি জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ ও কালো পতাকা উত্তোলন।
বরাবরের মতোই এবারও গতকাল শুক্রবার মধ্যরাত থেকেই সিলেটের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের দিকে যাত্রা শুরু হয়েছে সর্বস্তরের বাঙালির। রাত নয়টা থেকেই জিন্দাবাজার থেকে চৌহাট্টা মোড়, হাওয়াপাড়া রাস্তামুখ থেকে শহীদ মিনারগামী পথগুলোয় যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। বৃহস্পতিবার মধ্যরাত পর্যন্ত পথে পথে ঐতিহ্যবাহী আলপনা আঁকেন নবীন-প্রবীণ আঁকিয়েরা।
আজ ভোর থেকে সারা দিন কেউ মালা হাতে, কেউ সুদৃশ্য পুষ্পস্তবক নিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাবেন শহীদ মিনারের দিকে। থাকবে কালো ব্যানার, কালো ব্যাজ। নগ্ন পায়ে উঠবেন শহীদ মিনারের বেদিতে। কণ্ঠে থাকবে সেই চিরচেনা গান ‘আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/ আমি কি ভুলিতে পারি…।’
আজ সরকারি ছুটির দিন। সিলেটের মতো দেশের সর্বত্রই আজ সকালে প্রভাতফেরি করে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে বিনম্র শ্রদ্ধা জানানো হবে শহীদদের স্মৃতির প্রতি। সব সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে। দিনের অন্যান্য কর্মসূচির মধ্যে থাকবে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
প্রভাতফেরী : সিলেটের সম্মিলিত নাট্য পরিষদ এর উদ্যোগে একুশে প্রভাতফেরী শনিবার ঐতিহাসিক চাঁদনীঘাটের ক্বীনব্রীজ চত্ত্বর থেকে শুরু হবে। আজ শনিবার ভোর ৬ টায় শুরু হবে প্রভাতফেরী। নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে সিলেট কেন্দ্রিয় শহীদ মিনারে গিয়ে বীর ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন ও শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে শেষ হবে নাট্য পরিষদের প্রভাতফেরি।
গত বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে প্রায় বিলুপ্ত হওয়া বাঙালির সাংস্কৃতিক ধারা বজায় রাখতে প্রভাতফেরীর মাধ্যমে মূল চেতনায় ভোরের আলোয় খালি পায়ে মুখে একুশের গান আর ফুল নিয়ে এই আয়োজনে সিলেটের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনসহ সকল শ্রেণী ও পেশার মানুষকে অংশ নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন পরিষদের সভাপতি অনুপ কুমার দেব ও সাধারণ সম্পাদক রজত কান্তি গুপ্ত।
বাণী : অমর একুশে শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া পৃথক পৃথক বাণী দিয়েছেন।
রাষ্ট্রপতি তাঁর বাণীতে বলেন, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারি এখন বিশ্বের সব ভাষাভাষীর প্রেরণার উৎসব। প্রধানমন্ত্রী তাঁর বাণীতে সব ভেদাভেদ ভুলে একুশের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে জনগণের ভাগ্যোন্নয়নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। বিরোধীদলীয় নেতা তাঁর বাণীতে বাংলা ভাষাভাষী মানুষকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। বাণীতে বিএনপির চেয়ারপারসন বলেন, একুশের অম্লান চেতনা সব ষড়যন্ত্রকারী আধিপত্যবাদী শক্তিকে রুখতে আমাদের উদ্বুদ্ধ করবে।
এছাড়া ২১ফেব্র“য়ারি উপলক্ষে সংবাদপত্রগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র এবং বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো একুশের বিশেষ অনুষ্ঠান সম্প্রচার করবে।

Pin It on Pinterest

Share This

By continuing to use the site, you agree to the use of cookies. more information

The cookie settings on this website are set to "allow cookies" to give you the best browsing experience possible. If you continue to use this website without changing your cookie settings or you click "Accept" below then you are consenting to this.

Close