আদরে বাঁদর | সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ার

Spoiled Childধরলাম, হাইস্কুলের এক ছাত্র একদিন ক্লাসে শিক্ষকের সাথে বেয়াদবি করায় শাস্তিস্বরূপ শিক্ষক তাকে একটা চড় দিলেন। ঐ ছেলে বাসায় এসে তার বাবার কাছে শিক্ষকের নামে নালিশ জানালো। বাবা তার ছেলের প্রতি অসম্ভব দরদ দেখিয়ে বললেন, “কোন মাস্টরের এত সাহস আমার ছেলেরে মারে? দেখুম!”। মা’ও ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দিলেন। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের আদরের সন্তান আরকি…

এই থেকে নেতিবাচক পরিবর্তন শুরু। সামান্য একটা ঘটনা থেকেই ছেলে পেয়ে গেল প্রশ্রয়। এখন সে নিয়মিতই বেয়াদবি করে শিক্ষকদের সাথে। বড় গলায় কথা বলে। শিক্ষকেরা মান-ইজ্জতের ভয়ে তাকে আর ঘাটান না, এড়িয়ে চলেন।
সেই ছাত্র ধীরে ধীরে বড় হল। টেনেটুনে স্কুল পাশ করে কলেজে ভর্তি হলো। এখন সে নিজেকে বেশ বড় ভাবতে শুরু করে দিয়েছে। সবকিছুতেই সে অন্যরকমভাবে জোর করে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করে। তার কোন ভয় নেই, সে বুঝে গেছে তার মা-বাবা তাকে কিছু বলবেন না, তাই তার সাহসেরও কমতি নেই।
কলেজের মেয়েদেরকে তো পটাতে হবে রে! তাই একদিন সে বাসায় গিয়ে বাবার কাছে দাবী করল, “আমার একটা মোটরবাইক কিন্না দেও, নাইলে স্যুইসাইড করুম, দেইখো।”
বাবা ভয় পেলেন, আদরের ছেলে তো! বাইক কিনে দিলেন কষ্টের টাকায়।
পরিবারের প্রশ্রয় সবচেয়ে বড় প্রশ্রয়, পরিবার থেকে কোনকিছুর জন্য প্রশ্রয় পেয়ে গেলে সেটা আর দমানো সম্ভব হয়না, কোন পিছুটানও কাজ করে না। -এটা সেই ছেলের মধ্যে স্পষ্টতই ফুটতে শুরু করল।
বাবা যদি বেত দিয়ে পিটিয়ে বলতেন, “হারামজাদা,আয় তোরে স্যুইসাইড করাই” তাহলে নির্ঘাত ও শুধরে যেত। না, হয়নি।
একসময় সে নিজেকে ‘রাজনীতি’র সঙ্গে জড়িয়ে নিল। কারণ, ‘পাওয়ার পাইমু, সবাই চিনবো!’ এখন সে ক্যাম্পাসের বড় নেতা ভাবতে শুরু করল নিজেকে। ছেলে-মেয়ে সবাই তাকে বাধ্য হয়ে ‘স্লামালিকুম ভাই’ বলে, কিন্তু আড়ালে গিয়ে মনে মনে ‘অসভ্য বখাটে’ বলে গালি দেয়।
এই ছেলে ধীরেধীরে চাঁদাবাজ হয়ে ওঠে। সন্ত্রাসী হয়ে ওঠে। এখন তার বাবা-মা’ও তাকে ভয় পান।
পুরো এলাকার লোকজনও অতিষ্ঠ। ধীরে ধীরে সে একজন শীর্ষ সন্ত্রাসী হল। মাদকের ব্যবসা, খুন, ডাকাতি, ধর্ষণের মত অপরাধও সে ঘটাতে লাগল। তার বেশকিছু সাঙ্গপাঙ্গও জোটে গেল। পত্র-পত্রিকায় তার নাম আসল। পুলিশ নির্বিকার, পুলিশও তার টাকা খায়। বড় বড় রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক হল তার, তাই কেউই ওর বিরুদ্ধে কিছু করতে সাহস পায়না।
অতঃপর…
উপরের গল্পটা কাল্পনিক। কিন্তু সত্যিকার অর্থে বলতে গেলে, আমরা যে দেশে বাস করছি সে দেশের সমাজটাই এমন হয়ে গেছে। মা-বাবার সামান্য একটু অসচেতনতা আর সামান্য প্রশ্রয়ের প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ হয়ে দাঁড়ায়।
আমাদের মা-বাবাদের সচেতনতার ব্যাপারটা খুব জরুরী হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন। নইলে আমরা কেউ মানুষ হবো না।
লেখক: সম্পাদক, সুনামগঞ্জ মিরর

Pin It on Pinterest

Share This

By continuing to use the site, you agree to the use of cookies. more information

The cookie settings on this website are set to "allow cookies" to give you the best browsing experience possible. If you continue to use this website without changing your cookie settings or you click "Accept" below then you are consenting to this.

Close