বাপ-বেটিতে বধ ফকা-সাকা : এ্যাড, সিরাজী এম. আর. মোস্তাক

Adv-Sirajiকিছু কিছু শত্রুতা বংশানুক্রমে চলতে থাকে। কখনো তা সমাজ, রাষ্ট বা পৃথিবী পর্যন্ত গড়ায়। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ, ‘বাপ-বেটিতে বধ ফকা-সাকা’। এটা কোনো ভাষান্তর নয়। সঠিক বাংলা শব্দ ও বাস্তব ঘটনা।
এখানে যে বাপের কথা বলা হয়েছে, তিনি একজন শ্রেষ্ঠ মানব। তার সময়ে জেলের প্রকোষ্ঠে শহীদ হয়েছেন জনাব ফকা সাহেব। তিনিও একজন বিখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন। তার অবদানও স্মরণ রাখার মতো। তাই তার অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবরটা জনমনে নানা প্রশ্নের উদ্রেক করে। মূলত মানুষ যে কোনো সময় মারা যেতে পারে, কিন্তু মৃত্যুটা যদি জেলখানায় হয় বা অস্বাভাবিকভাবে হয়, তা অবশ্যই উদ্বেগের বিষয় হয়। আরো যদি মৃত্যুর খবর ধাঁমাচাপা দেবার চেষ্টা হয়, স্বাভাবিকভাবেই তাতে বিভিন্ন মন্তব্যের উৎপত্তি হয়। এরকম কিছু মন্তব্য তুলে ধরছি। জনাব জিবলু রহমান ১৭ই জানুয়ারী ২০১৫ তারিখে কে এম ফজলুল সোবহান চৌধুরীর লেখার উদ্ধৃতিতে উল্লেখ করেন, ১৯৭৩ সালের ১৮ জুলাই রাত আটটায় বিশেষ কোনো মহলের সুচতুর ষঢ়যন্ত্রে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে মারা যান জনাব ফজলুল কাদের চৌধুরী। ঐ রাতে খাবার গ্রহণের পর তাকে একটি কলা খেতে দেয়া হয়। কলা খাওয়ার পর তার শরীরে প্রচন্ড ঝাকুনি সৃষ্টি হয়। তিনি পানি চান। এরপরেই তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। সেদিন সংবাদ মাধ্যম গুলোতে মৃত্যু সংবাদ প্রচারে বাধা দেয়া হয়। ১৯ জুলাই দৈনিক ইত্তেফাকে লেখা হয়, জনাব চৌধুরীর মৃত্যু সম্পর্কে বিস্তারিত খবরের জন্য জেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কিছু জানা যায়নি। দৈনিক বাংলার কলামিষ্ট অনিকেত তার লেখায় এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। জনাব নির্মল সেনও উপসম্পাদকীয়তে গভীর ক্ষুব্ধতা প্রকাশ করেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন তার ‘একাত্তুরের স্মৃতি’ বইতে লিখেন, জেলেই ফজলুল কাদের চৌধুরীর মৃত্যু হয় প্রায় বিনা চিকিৎসায়। তার হার্টের দোষ ছিল। কয়েকবার পরীক্ষা করে তিনি তাকে হাসপাতালে পাঠাবার কথা বলেছিলেন। কিন্তু শেখ মুজিব রাজি হননি। ইতিহাসে এমন নিষ্ঠুরতার নজির বিরল। লাশের বুকটা খোলা ছিল। দেখলাম, কোন ওষুধের প্রতিক্রিয়ায় সারাটা অংগ বিবর্ণ হয়ে গেছে। এই কারণেই কেউ কেউ সন্দেহ করেছিলেন যে, বিষের ইনজেকশন দিয়ে তাকে মারা হয়েছে।
উল্লেখিত মন্তব্যের কোনো সঠিকতা না থাকলেও একটি অতীব সত্য হলো, জনাব ফজলুল কাদের চৌধুরী জেলখানাতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। এটি বধ করার বিশেষ প্রকরণ।
বর্তমানে চলছে বাপকা-বেটার বিচার প্রক্রিয়া। তা করছে একই বাপের বেটি। বেটা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী। সংক্ষেপে বলা হয় সাকা। তাকে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ফাঁসির চুড়ান্ত আদেশ দেয়া হয়েছে। এটি বিচার বিভাগীয় হত্যাকান্ডের একটি জ্বলন্ত প্রমাণ। এ প্রসঙ্গে অনুল্লেখ্য হলেও চিরায়ত সত্য যে, ১৯৭১ সালে এদেশে যে সমস্ত মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তার অধিকাংশই পাকিস্তানি সেনারা করেছে। তারা ২৫ মার্চে নারকীয় তান্ডব চালিয়েছে। তারা এদেশের ত্রিশ লাখ বাঙ্গালীকে শহীদ করেছে এবং দুই লাখ নারীর সম্ভ্রম কেড়েছে। তারা এদেশের যুদ্ধবিধ্বস্ত অসহায়, নির¯্র ও নিরপরাধ জনগণকে জঘন্য অপরাধ করতে বাধ্য করেছে। এজন্য যুদ্ধবিধ্বস্ত অসহায় বাংলাদেশীরা কখনো যুদ্ধাপরাধী হতে পারেনা। তখন এদেশের সাধারণ জনতা একবারেই নিরূপায় ছিল। কোনো বাংলাদেশীকে যুদ্ধাপরাধী সাব্যাস্ত করা দূরে থাক, তা বলাও চরম অন্যায়। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অসহায় নাগরিকদেরকে যুদ্ধকালিন অভিযোগের জন্য অভিযুক্ত করা সম্পুর্ণরূপে নিষেধ। তাই বাংলাদেশের কোনো নাগরিক ১৯৭১ সালে কোনো অপরাধ করে থাকলেও, তা নিতান্তই বাধ্য হয়ে করেছে। তারা পাক হানাদার বাহিনীর হাত থেকে বাঁচার জন্যই তা করেছে। এজন্য কোনো বাংলাদেশী কখনোই যুদ্ধাপরাধী হতে পারেনা। পাকি সেনারাই আসল যুদ্ধাপরাধী। তাদেরকে নির্দ্বিধায় ক্ষমা করে দিয়ে অসহায় বাংলাদেশীদেরকে যুদ্ধাপরাধী বিচারের নামে হত্যা করা সম্পুর্ণ অন্যায় ও অবৈধ। কিন্তু সেই অন্যায় ও অবৈধটি আজ বাস্তব। আজ আইনের বিচার নেই। বিচারের নামে চলছে শুধু বধ করার হলিখেলা। কে অপরাধী আর কে নিরপরাধ, তারও কোনো বাচ-বিচার নেই। হাজারো প্রমাণকে পাশ কাটিয়ে অন্যায়ভাবে আদেশ দেয়া হচ্ছে ৯০ বছরের জেল, আজীবন জেল আর মৃত্যুদন্ড। যেন যত বড় আদেশ হবে, তত বড় বিচারক প্রমাণ হবে। এটা আইন ও বিচারের নামে স্পষ্ট প্রহসন।
বিচারের নামে অন্যায় ও অবিচারের একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ এখানে উল্লেখ করছি। জনাব সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধূরীকে যাদের হত্যার জন্য অভিযুক্ত করা হয়েছে, তা সংঘটনের সময়ে তিনি দেশেই ছিলেন না। এর প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য দেবার জন্য অনেক প্রভাবশালী বিদেশী ব্যক্তিগণ সরকারের কাছে আবেদন করেছেন। আর সরকারও তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। এমনকি উক্ত বিদেশী সাক্ষীদেরকে বাংলাদেশে প্রবেশের ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। অর্থাৎ সরকার বিচারক না হলেও নিজেই বিচার করছেন। বিচারপতিরা পুতুল মাত্র। সরকার যা আদেশ করবেন, তারা তাই লিখবেন। এভাবে আইন ও বিচারের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে দেশে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে। তাই অত্র শিরোনাম ‘বাপ-বেটিতে বধ ফকা-সাকা’ একান্তই যথার্থ ও সঠিক হয়েছে।

mrmostak786@gmail.com
 ০১৭৩৮-৬৯১৭০৯ / ০১৭২৪-৭৫৫৭৮৫

Pin It on Pinterest

Share This

By continuing to use the site, you agree to the use of cookies. more information

The cookie settings on this website are set to "allow cookies" to give you the best browsing experience possible. If you continue to use this website without changing your cookie settings or you click "Accept" below then you are consenting to this.

Close