ফুড সেফটি ল্যাবরেটরির পরীক্ষা : ৮৭ ভাগ ভোজ্য তেলে ভেজাল

Furnished Oilসুরমা টাইমস ডেস্কঃ দেশীয় বাজারে বিক্রি হওয়া ভোজ্য তেলের অধিকাংশই ভেজাল বা মানহীন। এ মানহীন তেলে স্বল্প থেকে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। খোদ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (আইপিএইচ) পরিচালিত ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরিতে (এনএফএসএল) পরীক্ষায় ভোজ্য তেলে ভেজালের বিষয়টি ধরা পড়েছে। গবেষণা সূত্র বলছে, দেশে বিক্রি হওয়া ভোজ্য তেলের ৫০ থেকে ৮৭ শতাংশই ভেজাল। এসব ভোজ্য তেলে ফ্রি ফ্যাটি এসিডের (অলিক এসিড) মাত্রা সহনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। পাশাপাশি তেলের গুণগত মানও বেশ নিচু। মান যাচাইয়ের জন্য সয়াবিন তেলের ৪০০টি নমুনা সংগ্রহ করে আইপিএইচ। পাবলিক হেলথ ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষায় ৩৪৯টি বা ৮৭ দশমিক ২৫ শতাংশ নমুনায় ভেজাল শনাক্ত হয়। আর বাজারে বিক্রি হওয়া অন্য তেলগুলোতেও শতকরা ৫০ ভাগ ভেজাল পেয়েছে আইপিএইচ।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানান, ভেজাল ও মানহীন ভোজ্য তেলের নিয়মিত ব্যবহারে স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি হতে পারে। স্বল্প মেয়াদে বদহজম, গ্যাস্ট্রিক, খাবারে অরুচি ও হৃৎপিণ্ডে ক্ষত সৃষ্টি করে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে হৃৎপিণ্ড, যকৃৎ ও ফুসফুসও আক্রান্ত হতে পারে। কারণ ভোজ্য তেলে এসিটিক এসিডের মাত্রা বেশি হলে টক্সিসিটি বেড়ে যায়। তাই স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ার আগেই ভেজালরোধে নজরদারি বাড়ানো জরুরি বলে মত দিয়েছেন তারা। পাশাপাশি দোষীদের শাস্তির বিধান আরও কঠোর করার সুপারিশ করেছেন।
উল্লেখ্য, ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরিতে (এনএফএসএল) বিভিন্ন উৎস থেকে সংগৃহীত নানা ধরনের ভোজ্য তেলের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। খাদ্য আইন অনুযায়ী তেলের মধ্যে কোন উপাদান কী পরিমাণ থাকবে তা নির্ধারণ করে দেয়া আছে। সে মোতাবেক ফ্রি ফ্যাটি এসিডের (অলিক এসিড হিসেবে) পরিমাণও নির্ধারণ করে দেয়া আছে। আর এ পরীক্ষায় এনএফএসএল ভোজ্য তেলে শুধু একটি প্যারামিটার (ফ্রি ফ্যাটি এসিডের মাত্রা) পরীক্ষা করেছিল।
এনএফএসএল গত বছরের ৭ই জুলাই থেকে চলতি বছরের ৩১শে মে পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগৃহীত বোতলজাত ও খোলা সয়াবিন, সরিষা ও নারিকেল তেলের ৭৭টি নমুনায় ফ্রি ফ্যাটি এসিডের মাত্রা পরীক্ষা করে। এতে ৩০টি নমুনায় স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেশি ফ্রি ফ্যাটি এসিড পাওয়া যায়। বিদেশ থেকে আমদানি করা ভোজ্য তেল পরিশোধনের মাধ্যমে নিরাপদ ও খাওয়ার উপযোগী করতে হয়। কিন্তু বেশ কিছু কোম্পানি খরচ বাঁচাতে সঠিকভাবে তেল পরিশোধন করছে না।
আইপিএইচ সূত্রে জানা গেছে, বোতলজাত সয়াবিন তেলের ১৩টি নমুনা পরীক্ষা করে ৬টিতে মাত্রাতিরিক্ত ফ্রি ফ্যাটি এসিড পাওয়া গেছে। সয়াবিন তেলে ফ্রি ফ্যাটি এসিডের গ্রহণযোগ্য সর্বোচ্চ মাত্রা হচ্ছে ২ শতাংশ। কিন্তু পরীক্ষিত ১৩টি নমুনার মধ্যে ৬টিতেই ২.২ থেকে ২.৮ শতাংশ পর্যন্ত ফ্রি ফ্যাটি এসিডের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। খোলা সয়াবিন তেলের অবস্থা আরও খারাপ। দুটি নমুনা পরীক্ষা করে আইপিএইচ দুটিতেই ২.৬ থেকে ৩.৫ শতাংশ পর্যন্ত ফ্রি ফ্যাটি এসিডের উপস্থিতি পেয়েছে।
বাজারে বিক্রীত সরিষার তেলেও মাত্রাতিরিক্ত ফ্রি ফ্যাটি এসিড পেয়েছে আইপিএইচ। সরিষার তেলে ফ্রি ফ্যাটি এসিডের সর্বোচ্চ স্বাভাবিক মাত্রা ১.২৫ শতাংশ। কিন্তু আইপিএইচের পরীক্ষায় বোতলজাত সরিষার তেলের ১৯টি নমুনার মধ্যে ১০টিতেই ১.৩ থেকে ২ শতাংশ পর্যন্ত ফ্রি ফ্যাটি এসিড পাওয়া গেছে। খোলা সরিষার তেলের ৫টি নমুনার মধ্যে চারটিতেই ১ দশমিক ৩ থেকে ২ দশমিক ৪ শতাংশ পর্যন্ত ফ্রি ফ্যাটি এসিড শনাক্ত হয়েছে।
বাদাম তেল ও তিলের তেলের অধিকাংশ নমুনায়ও মাত্রাতিরিক্ত ফ্রি ফ্যাটি এসিড পাওয়া গেছে। শুধু নারিকেল তেলের বেশির ভাগ নমুনায় নিরাপদ মাত্রায় ফ্রি ফ্যাটি এসিড পাওয়া গেছে। আইপিএইচের পরীক্ষায় নারিকেল তেলের ১৭টি নমুনার মধ্যে চারটিতে মাত্রাতিরিক্ত ফ্রি ফ্যাটি এসিড শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া অলিভ অয়েল ও রাইস ব্র্যান অয়েলে স্বাভাবিক মাত্রায় ফ্রি ফ্যাটি এসিডের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) তথ্য অনুযায়ী, সঠিক মানের সয়াবিন তেল নির্ণয় করতে এর রং, এসিড ও আয়োডিন ভ্যালু, রেজিস্টিভ ইনডেক্স ও মেল্টিং পয়েন্ট পরীক্ষা করা হয়। যেসব তেল সঠিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে পরিশোধন করা হয়, সেগুলোয় এসিড ভ্যালু কম থাকে। যেগুলোয় এসিড ভ্যালু বেশি থাকে, সেগুলো পরিশোধন ছাড়াই বা স্বল্প পরিশোধনে বাজারজাত করা হয়।
এনএফএসএলের এক কর্মকর্তা জানান, স্যানিটারি ইন্সপেক্টরদের মাধ্যমে সারা দেশ থেকে সংগৃহীত নমুনা তারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। এসব তেলের মধ্যে শুধু ফ্রি ফ্যাটি এসিডের মাত্রা পরীক্ষা করা হয়। তবে অন্য প্যারামিটার পরীক্ষা করা হয়নি বলে জানান তিনি।
জনস্বাস্থ্য ল্যাবরেটরির একজন পরীক্ষক ও মানবিশ্লেষক জানান, সয়াবিন তেলের মান পরীক্ষা করে উচ্চমাত্রার ভেজাল পাওয়া গেছে। এসব সয়াবিন তেলের মধ্যে পাম বা নিম্নমানের তেল মিশ্রণের প্রমাণ মিলেছে। এ ছাড়া পরীক্ষায় বেশির ভাগ কোম্পানির তেলে এসিডের মাত্রা বেশি রয়েছে। যেসব নমুনায় উপাদানগুলো সঠিক অনুপাতে পাওয়া যায়নি, সেগুলোকেই ভেজাল বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
আইপিএইচের পরিচালক ডা. এ কে এম জাফর উল্যাহ বলেন, ভোজ্য তেলে এ ধরনের ভেজালের কারণে মানবদেহে শক্তির জোগান ও টিস্যু গঠন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তার মতে, এসিটিক এসিডের অতিরিক্ত এ মাত্রা হার্টের জন্য ভয়ঙ্কর ক্ষতির কারণ হতে পারে। এমনকি ক্যানসারের মতো রোগও হতে পারে। এ ছাড়া মানহীন সয়াবিন তেল হাইপারটেনশন, ডায়াবেটিসসহ শরীরের ওজন অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেয়।
আইপিএইচ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে মাথাপিছু দৈনিক প্রাপ্ত ক্যালরির মাত্র ৯ শতাংশের উৎস হচ্ছে ভোজ্য তেল। আর মানবদেহের জন্য অত্যাবশ্যকীয় ফ্যাটি এসিডেরও উৎস হতে পারে ভোজ্য তেল। কিন্তু অতিমাত্রায় ভেজালের কারণে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় মিলছে না এসব উপাদান। বরং হিতের বিপরীত হচ্ছে, বাড়িয়ে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত স্বাস্থ্যঝুঁকি।
জানা যায়, দেশে প্রতি বছর ১৮-২০ লাখ টন ভোজ্য তেলের চাহিদা রয়েছে। বিপুল পরিমাণ এ চাহিদার বিপরীতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ২-৪ লাখ টন। ফলে চাহিদার প্রায় পুরোটাই মেটানো হয় আমদানির মাধ্যমে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, ২০০৯-১০ অর্থবছরে ভোজ্য তেল ও তেলবীজ আমদানি ছিল ৮ হাজার ১৬০ কোটি টাকার। পরের দুই অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ হাজার ৩৩৬ কোটি ও ১৪ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা। তবে ২০১২-১৩ অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ কিছুটা কমে দাঁড়ায় ১৩ হাজার ১১৭ কোটি টাকা। কিন্তু ২০১৩-১৪ প্রথম প্রান্তিকেই আমদানি দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা। মানবজমিন

Pin It on Pinterest

Share This

By continuing to use the site, you agree to the use of cookies. more information

The cookie settings on this website are set to "allow cookies" to give you the best browsing experience possible. If you continue to use this website without changing your cookie settings or you click "Accept" below then you are consenting to this.

Close