রোমহর্ষক ব্যাংক ডাকাতি : গ্রেনেড, বোমা, গুলি, ম্যানেজারসহ নিহত ৮

ashulia-dakat-সুরমা টাইমস ডেস্কঃ রোমহর্ষক ব্যাংক ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে আশুলিয়ায়। ডাকাত দল ব্যাংকে হানা দিয়ে গুলি, গ্রেনেড বিস্ফোরণ ও কুপিয়ে ম্যানেজারসহ ৭ জনকে হত্যা করে। এ ছাড়া ডাকাতদের গুলি ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত হয়েছেন আরও ১৭ জন। তাদের সাভার এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অন্যদিকে জনতার পিটুনিতে এক ডাকাত নিহত হয়েছে। ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থলে র‌্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এসে উপস্থিত হন। পুলিশ ব্যাংকের নিচে ও আশপাশ থেকে পাঁচটি অবিস্ফোরিত গ্রেনেড উদ্ধার করেছে। এদিকে স্থানীয় জনতা এক ডাকাতকে ধরে পিটিয়ে মেরেছে। পুড়িয়ে দিয়েছে ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি। এ ছাড়া ডাকাতদের ফেলে যাওয়া অসংখ্য শক্তিশালী বোমা উদ্ধার করে নিষ্ক্রিয় করেছে র‌্যাবের বোমা ডিসপোজাল ইউনিট। গতকাল দুপুরে ‘বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক লিমিটেড’ কাঠগড়া বাজার শাখায় এ ঘটনা ঘটে। নিহতরা ashulia-dakat-picহলেন- ব্যাংকের ব্যবস্থাপক মো. অলিউল্লাহ (৪৫), ব্যাংকের গানম্যান বদরুল আলম (৩৮), ব্যাংকের গ্রাহক কাঠগড়া এলাকার একটি প্রিন্টিং কারখানার মালিক সাহাবুদ্দিন পলাশ (৪৮), ব্যাংক ভবনের নিচে ঝালমুড়ি বিক্রেতা মুনির হোসেন (৬০), ব্যাংক ভবনে অবস্থিত মার্কেটের দোকানি জিল্লুর রহমান এবং কুটুরিয়া এলাকার জমির (৩৮), ব্যবসায়ী নূর মোহাম্মদ (৩৫)। এ ছাড়া গণপিটুনিতে নিহত ডাকাত সদস্যের পরিচয় পাওয়া যায়নি।
নিহত ব্যাংকের ম্যানেজারের বাড়ি জামালপুর জেলায়। তিনি সাভার আড়াপাড়ায় বসবাস করতেন। গুলিতে নিহত ব্যাংকের গ্রাহক সাহাবুদ্দিন পলাশের পিতার নাম শামসুদ্দিন মোল্লা। তার বাড়ি ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা থানার লক্ষণদিয়া গ্রামে। তিনি কাঠগড়া এলাকার একটি প্রিন্টিং কারখানার মালিক ছিলেন। টাকা উত্তোলনের জন্য তিনি ব্যাংকে গিয়েছিলেন।
গুলিতে নিহত ঝালমুড়ি বিক্রেতা মুনির হোসেনের বাড়ি ঢাকার নবাবগঞ্জ থানার কলাকুপাবান্দোরা এলাকায়।
ashulia-dakatএদিকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন গুলিবিদ্ধ জমির সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে মারা যান বলে ঘটনাস্থলে উপস্থিত আশুলিয়া থানার এসআই জাকারিয়া হোসেন জানিয়েছেন।
সরজমিন ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের শাখাটি হাজী নজুমদ্দিন সুপার মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত। বিশমাইল-জিরাব সড়ক থেকে সরু গলি দিয়ে পায়ে হেঁটে ব্যাংকে যেতে হয়। আর গলির দুই পাশে রয়েছে অসংখ্য দোকানপাট। অবশ্য ঘটনার পরপরই ওই এলাকার সকল দোকানপাট বন্ধ হয়ে এক ভুতুড়ে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
ব্যাংকের কাছে ঢুকতেই দোতলার ফ্লোরে রক্তের স্তূপ জমাট বেঁধে রয়েছে। র‌্যাব পুলিশ ‘ক্রাইম সিন’ ফিতা দিয়ে ঘটনাস্থল ঘিরে রেখেছে।
স্থানীয় অনেকেই জানিয়েছে, ডাকাতরা প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেল নিয়ে আসে। তারা তাদের ব্যবহৃত যানবাহন রেখে যায় মূল সড়কে।
ঢাকা জেলার সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) রাসেল শেখ বলেন, ডাকাতের গুলিতে পাঁচজন নিহত হয়েছেন। দুই ডাকাতকে ধরে ফেলে জনতা। এর মধ্যে গণপিটুনিতে একজন মারা গেছে। বিষয়টি গভীর ভাবে তদন্ত চলছে বলেও তিনি জানান।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গতকাল দুপুর আড়াইটার দিকে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকারযোগে আসা ৮/১০ জনের একদল ডাকাত গ্রাহকবেশে ওই ব্যাংকে প্রবেশ করে। এ সময় কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রথমে ব্যবস্থাপককে একটি গ্রেনেড দিয়ে জিম্মি করে পরে অন্য কর্মকর্তাদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ফেলে। একপর্যায়ে বোমা ও গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে লুটপাট শুরু করে ডাকাতরা। তাদের বেপরোয়া গুলি, বোমা ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে ব্যাংকের অভ্যন্তরে ঘটনাস্থলেই মারা যান শাখা ব্যবস্থাপক অলিউল্লাহসহ, গ্রাহক পলাশ ও নিরাপত্তা কর্মী বদরুল আলম।
এদিকে ব্যাংকে ডাকাতির বিষয়টি পার্শ্ববর্তী মসজিদ থেকে মাইকিং করা হলে পাশের বাজার ও এলাকাবাসী এগিয়ে এসে ডাকাতদের ঘিরে ফেলে। এ সময় ডাকাতরা এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়লে ব্যাংকের নিচে মারা যান ঝালমুড়ি বিক্রেতা মনির হোসেন ও ওই মাকের্টের ক্রোকারিজ দোকানি জিল্লুর রহমান। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সন্ধ্যায় মারা যান কুটুরিয়া এলাকার জমির নামে এক যুবক।
ক্ষুব্ধ জনতা গুলি উপেক্ষা করে ডাকাতদের ধাওয়া দিলে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে বিশমাইল-জিরাব সড়কের আমতলা এলাকার আজমত গ্রুপের সামনে মোটরসাইকেলসহ ধরা পড়ে দুই ডাকাত। এ সময় তারা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে ঘটনাস্থলেই গণপিটুনিতে মারা যায় অজ্ঞাত এক ডাকাত সদস্য। আরেক ডাকাতকে ধরে পুলিশে সোপর্দ করে জনতা।
গুরুতর আহত ১৭ জনকে বিভিন্ন যানবাহনে করে সাভারে এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাৎক্ষণিক একযোগে এত বেশি সংখ্যক গুলিবিদ্ধসহ আহতদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খেতে হয় কর্তব্যরত চিকিৎসকদের। পরে আরও একজন মারা যান।
এদিকে ঘটনার পরপরই পুলিশ গিয়ে বিশমাইল-জিরাবো সড়ক ও সিএন্ডবি সড়কের বিভিন্ন পয়েন্ট চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি শুরু করেছে।
এদিকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত জনতা অনেকেই বলাবলি করছিল যে, ব্যাংকে ডাকাতির পর কর্মকর্তাদের হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোন রহস্য থাকতে পারে। ডাকাতি তাদের বাহানা ছিল। পুলিশ সঠিক তদন্ত করলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে বলেও তারা বলাবলি করছিল।
ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান ঘটনাস্থল ও এনাম মেডিক্যাল কলেজ পরিদর্শন শেষ করেছেন। পরে তিনি বলেন, লুণ্ঠিত টাকা উদ্ধার হয়েছে। এ ছাড়া ডাকাত দলকে ধরতে বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চলছে।
আরেক প্রত্যক্ষদর্শী রবিন দেওয়ান নামে এক ব্যক্তি বলেন, ৪/৫টি মোটরসাইকেলে চড়ে ডাকাতরা আসে। ডাকাতরা ব্যাংকে হামলা চালানোর পর স্থানীয় মসজিদের মাইকে ডাকাতদের প্রতিরোধের আহ্বান জানায় এলাকাবাসী। তখন ডাকাতরা গুলি চালালে পাঁচজন নিহত হন।
রবিন বলেন, প্রতিরোধের মুখে ডাকাতরা পালাতে থাকে। এর মধ্যে একটি মোটরসাইকেল পড়ে গেলে জনতা দুই ডাকাতকে ধরে মারধর করে। তাদের একজন ঘটনাস্থলে মারা যায়। অন্যজনকে পুলিশে দেয়া হয়।
ঘটনাস্থলে ডাকাতদের ফেলে যাওয়া ৫ লাখ ৯৪ হাজার ২৫৫ টাকা ভর্তি একটি ব্যাগ উদ্ধার করা হয়। সন্দেহভাজন ডাকাতদের ওই মোটরসাইকেলটি জ্বালিয়ে দিয়েছে জনতা।
গুলিবিদ্ধদের সাভার এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে বলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক মাহমুদ হাসান জানান। এ ছাড়া তাদের হাসপাতালে পাঁচটি লাশ রয়েছে। যাদের হাসপাতালে আনার আগেই মারা গেছে।
এদিকে পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) এস এম মাহফুজুল হক নুরুজ্জামান বলেন, ঘটনার পরপরই পুলিশ এলাকায় অভিযান শুরু করেছে। কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ব্যাংকটি যে ভবনে অবস্থিত সেই ভবনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বরকত জানান, ব্যাংকে ডাকাত পড়েছে শুনে ঘটনাস্থলে এসে দেখি ব্যাংকের ম্যানেজার ও নিরাপত্তা কর্মী রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন। গুলিবিদ্ধ ও কোপানো অবস্থায় আরও ১০-১৫ জন পড়ে চিৎকার করছে। আমি দ্রুত তাদেরকে করে হাসপাতালে পাঠাই।
গুলিবিদ্ধসহ আহতদের পরিচয়: পারভেজ, নুর ইসলাম, আয়ুব আলী, নুর মোহাম্মদ, শফিকুল ইসলাম, সাজ্জাদ আলী, সাইফুল ইসলাম, রমজান, শাহজাহান, আনিছ, আয়ুব আলী, সাইফুল ইসলাম, হামেদ আলী, শাহাজাদ, রফিক, আবদুল হক ও সালাম। তারা সকলেই সাভার এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। (মানবজমিন)

Pin It on Pinterest

Share This

By continuing to use the site, you agree to the use of cookies. more information

The cookie settings on this website are set to "allow cookies" to give you the best browsing experience possible. If you continue to use this website without changing your cookie settings or you click "Accept" below then you are consenting to this.

Close