এক স্কুল ছাত্রীর ৮ মাসের নির্মম কাহিনী!

full_717047849_1সুরমা টাইমস ডেস্কঃ গত মার্চে রাজধানীর কেরানীগঞ্জের একটি স্কুলের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী রিঙ্কুকে (১৪) ভারতের একটি পতিতালয়ে বিক্রি করে দিয়েছিল এক পাচারকারী দল। সম্প্রতি মেয়েটি কোনোভাবে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরেছে। মেয়েটি, বলেছে পতিতালয়ের দিনগুলো ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে জঘন্য ও নিকৃষ্টতম দিন।
রিঙ্কু তার আইনজীবী অ্যাডভোকেট শাহীন মমতাজের কাছে তার পাচার হওয়ার কাহিনী ও সেখানকার জীবনযাপন সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছে। আইনজীবী শাহীন মমতাজ জানিয়েছেন, মেয়েটি ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে। আমরা তাকে সাহস দিয়ে স্বাভাবিক করে তোলার চেষ্টা করছি।
গত ১৫ মার্চ রিঙ্কু আক্তার শিমু নামের এই মেয়েটি ঢাকার উদয়ন এলাকায় তার বড় বোনের বাসায় বেড়াতে যায়। সেখানে রিঙ্কু পাশের বাসার রাজু নামের এক লোকের স্ত্রী সাথীর সাথে পরিচিত হয়। সাথী এ সময় গর্ভবতী ছিল। রাজু এক পর্যায়ে রিঙ্কুকে পাচারের উদ্দেশ্যে সিরাজুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দেয়। সিরাজুলের বাড়ি নাটোর জেলায়। সেও ওই ভবনের একটি রুমে থাকত।
রিঙ্কু জানিয়েছে, বোনের বাসায় বেড়াতে যাওয়ার পরের দিন সিরাজুল তাকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়। সে আমাকে বিয়ে করতে চায়। কিন্তু আমি কখনও তার প্রস্তাবে রাজি হয়নি। রিঙ্কুর দুলাভাই আশরাফ উদ্দীন জানিয়েছেন, আমি রিঙ্কুকে সাথী নামের ওই নারীর সাথে কথা বলতে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু সাথী নানা অজুহাতে আমাদের বাসায় আসত এবং গল্পচ্ছলে তাদের রুমে নিয়ে যেত। ১৫ মার্চে পাচারকারী সিরাজুলের সাথে রিঙ্কুর কথা হয় সাথীদের রুমে।
গত ২৬ মার্চ সকাল ৭টায় রিঙ্কু তার বাসায় যাওয়ার জন্যে প্রস্তুতি নিয়ে সাথীর কাছ থেকে বিদায় নিতে যায়। এ সময় সাথী তাকে নাস্তা করতে দেয়। এমন সময় সিরাজুল চলে আসে এবং রিঙ্কুকে জিজ্ঞাসা করে কোথায় যাচ্ছ। যখন রিঙ্কু বলে বাড়ি যাচ্ছি তখন সিরাজুল তার গালের মধ্যে রুমাল পুরে দেয় এবং রিঙ্কু অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়।
রিঙ্কুর দুলাভাই আশরাফ উদ্দীন বলেছেন, রিঙ্কুকে অপহরণ ও পাচারের কাজে সাহায্য করায় সিরাজুল সাথীকে ৫০০ টাকা দেয়। রিঙ্কু জানিয়েছে, আমি যখন অচেতন অবস্থা থেকে জেগে উঠি তখন দেখি আমি একটি নৌকার উপর। আমার পাশে সিরাজুল ছিল। তার সাথে সাকিব ও মইনুল নামের আরো দুইজন লোক ছিল। এ সময় আমি কাঁদছিলাম ও চিৎকার করছিলাম। আমি বলছিলাম, আমি বাড়ি যেতে চাই। কিন্তু সিরাজুল বলছিল, সে আমাকে তার বাড়িতে তার মায়ের কাছে নিয়ে যাচ্ছে। সেখানে নিয়ে গিয়ে সে আমাকে বিয়ে করবে।
রিঙ্কু জানায়, এ সময় আমি কাঁদছিলাম এবং বলছিলাম, আমি আপনাকে চিনি না, আমি কেন আপনাকে বিয়ে করব। এ সময় আমি জোরে চিৎকার করতে পারছিলাম না। কারণ, আমি দীর্ঘ সময় ধরে কিছু না খেয়ে খুব অসুস্থ হয়ে পড়ি।
এরপর একটি রাস্তার পাশে সিরাজুল নৌকা থামায়। সেখানে একজন লোক মাইক্রোবাস নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। এ সময় সিরাজুল আমার আমার হাত টেনে ধরে এবং বলে সে আমাকে তার বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছে। নৌকা থেকে নেমে সিরাজুল তাকে নিয়ে কিছুদূর হাঁটে। এ সময় তার পার্টনার কোথা থেকে যেন উচ্চস্বরে বলে, এ রাস্তা দিয়ে এসো না। এ রাস্তায় পুলিশ আছে।
ওই মাইক্রোবাসের পাশে ইব্রাহিম নামের এক লোক দাঁড়িয়ে ছিল। সে সীমান্ত এলাকার একজন কুখ্যাত পাচারকারী। সাকিব ও মইনুলের সহায়তায় সিরাজুল রিঙ্কুকে ঢাকার নবীনগর এলাকায় নিয়ে যায়। গত ২৭ মার্চ রাত ১১টায় তারা হানিফ পরিবহনের একটি বাসে করে ইব্রাহিমের সহায়তায় বেনাপোল যায়। পরে সেখান থেকে তারা কোনো সমস্যা ছাড়াই ভারতে প্রবেশ করে।
রিঙ্কু জানায়, আমি দেখলাম রাস্তার পাশে পুকুর ও বড় বড় কলা গাছ। কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম না যে আমি ভারতে অবস্থান করছি। পরে একটি প্রধান সড়কে এসে সিরাজুল আমাকে নিয়ে একটি গাড়িতে ওঠে। ৩০ মিনিট চলার পর গাড়িটি গিয়ে একটি দোতলা বাড়ির পাশে গিয়ে থামে। কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম না যে আমি পশ্চিমবঙ্গের শিবপুর এলাকায় চলে এসেছি।
পরে সিরাজুল ওই ভবনের দোতলায় নিয়ে যায় যেখানে একজন নারী বসা ছিল। রিঙ্কু বলেছে, আমি তার দিকে একবার তাকিয়ে ভয় পেয়েছিলাম। সিরাজুল রিঙ্কুকে রেখে আসার সময় বলেছিল, আমি আবার এসে তোমাকে তোমার মায়ের বাসায় নিয়ে যাব।
রিঙ্কু বলেছে, সেখানে তার বয়সী ৫-৬ জন মেয়ে ছিল। কিন্তু প্রথমে আমি বুঝতে পেরেছিলাম না যে এটি একটি পতিতালয়। ওই পতিতালয়টি ওই নারী ও তার ভাইপোর বউ মিলে চালাত। ওই নারী রিঙ্কুকে জিজ্ঞাসা করত, তার কি সিরাজুলের সাথে প্রেমের সম্পর্ক আছে। রিঙ্কু বলত না। আমি বাড়ি ফিরে যেতে চাই। কিন্তু ওই নারী বলত, তোমাকে ফিরিয়ে নেয়ার জন্যে এখানে আনা হয়নি।
রিঙ্কু বলেছে, আমি ওই নারীকে অনেক টাকা দিতে দেখি। সিরাজুল সেটি নিয়ে চলে যায়। পরে ওই নারী আমাকে জিজ্ঞাসা করে, তোমার কি কারো সাথে শারীরিক সম্পর্ক আছে। আমি বলি না। পরে সে বলে ভালো। এই ব্যবসায় এ ধরনের মেয়েদের অনেক চাহিদা। তোমাকে অনেক টাকায় বিক্রি করা যাবে।
মেয়েটি বলেছে, পরে ওই নারী বিভিন্নজনকে ফোন করত এবং বলত এখানে একজন কুমারী আছে। এই বলে সে হাসত এবং বলত তাড়াতাড়ি আস। পরে রিঙ্কুকে একটি রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আরো মেয়েরা ছিল।
তারা রিঙ্কুকে জিজ্ঞাসা করে, তুমি কী এখানে নিজের ইচ্ছায় এসেছ। রিঙ্কু বলে না, আমাকে জোর করে আনা হয়েছে। তারপর মেয়েরা বলে, তুমি জান না, তোমাকে কোথায় আনা হয়েছে। এটি একটি পতিতালয়। এখানে সবাইকে টাকার বিনিময়ে যৌন সেবা দিতে হয়।
এরপর সেখান থেকে একটি মেয়ে রিঙ্কুর কান্না দেখে তাকে ৬০০ টাকা দেয় এবং পালিয়ে আসার পথ দেখিয়ে দেয়। কিন্তু রিঙ্কু তাকে জিজ্ঞাসা করে, সে কেন পালিয়ে যায় না। মেয়েটি বলে, সে টাকা উপার্জনের জন্যে নিজের ইচ্ছায় এখানে এসেছে।
রিঙ্কু একদিনসুযোগ বুঝে দ্রুত দরজা খুলে পালিয়ে যায়। পরে দীর্ঘ এক ঘণ্টা হেঁটে শিয়ালদা বাস স্টেশনে এসে সেখান থেকে সে বাসে করে বনগাঁ যায়। যখন রিঙ্কু বাসে উঠতে যাচ্ছিল, তখন একজন মহিলা এসে তাকে চেপে ধরে এবং বলে তোমার বড় সাহস। আমার সাথে আস। তোমাকে একটি শিক্ষা দিব। পরে রিঙ্কুর চিৎকারে চারপাশ থেকে লোক এসে জড়ো হয়। রিঙ্কু জনগণের সামনে বিষয়টি খুলে বললে লোকজন মহিলাকে ধরে মার দেয়।
পরে তাদেরকে যাদবপুর থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরের দিন তাদের আদালতে হাজির করা হলে ওই নারী পুলিশকে ঘুষ দিয়ে পালিয়ে যায়। পরে রিঙ্কুকে একটি বেসরকারি সংগঠন ‘সংলাপ’ এর হাতে তুলে দেয়া হয়।
এর মধ্যে রিঙ্কুর বাবা মা তাকে চারিদেকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল। এমন সময় আশরাফের একজন প্রতিবেশী বলে ওইদিন তথা যেদিন তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ওইদিন দুপুরে সে রিঙ্কুকে সিরাজুলের সাথে দেখেছে।
এরপর কয়েকদিন ধরে সিরাজুলের ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ঘটনার তিনদিন পর সিরাজুল আবার বাসায় ফিরে আসে এবং বলে সে মেয়েটিকে বিয়ে করেছে। সে এখন নাটোরে তার নিজ বাসায় রয়েছে। পরে রিঙ্কুর পরিবার সিরাজুলের বাবা মায়ের সাথে যোগাযোগ করলে তারা বিষয়টি অস্বীকার করে।
সাকিবের দুলাভাই ওই একই বাসায় থাকত। সাকিব বলে, রিঙ্কু ও সিরাজ পাবনায় আছে। পরে বাবু ও আশরাফ দু’জনেই মইনুলের বাড়ি পাবনায় যায় এবং মেয়ে হারানোর বিষয়টি খুলে বলে।
গত ২৮ মার্চ তারা সিরাজুলকে দেখতে পায় এবং তাকে মারধর করে গণিগাছা ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের কাছে নিয়ে যায়। সেখানে সিরাজুল স্বীকার করে, সে রিঙ্কুকে ১৩ হাজার টাকায় বিক্রি করেছে। এ থেকে সাকিব ৫ হাজার, সিরাজুল ৪ হাজার ও মইনুল ৪ হাজার টাকা নিয়েছে। সে রিঙ্কুকে ফিরিয়ে আনার জন্যে আরো ৪০ হাজার টাকা দাবি করে। পরে সিরাজুলকে ঢাকায় এনে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয়।
গত ৫ এপ্রিল সিরাজুলসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জালাল উদ্দীন জানিয়েছেন, সিরাজুল একজন এফআইআর ভুক্ত আসামি। তাকে গত ৬ এপ্রিল আদালতে হাজির করা হয়েছিল।
ভারতের ‘সংলাপ’ সেফ হাউজে আট মাস থাকার পর গত ৫ ডিসেম্বর রিঙ্কুকে ঢাকায় আনা হয়েছে।
রিঙ্কু বলেছে, ‘ভারতে গত এই কয়মাস আমার জীবন সবচেয়ে খারাপভাবে কেটেছে। আমি জীবনে কোনো পাপ করিনি। কেন আমার সাথে এমন ঘটনা ঘটল। শুধু যে মেয়েটি পাচারের শিকার হয়েছে সে আমার বিষয়টি বুঝতে পারবে। আমি বিচার চাই। আমি অপরাধীদের শাস্তি চাই।’

Pin It on Pinterest

Share This

By continuing to use the site, you agree to the use of cookies. more information

The cookie settings on this website are set to "allow cookies" to give you the best browsing experience possible. If you continue to use this website without changing your cookie settings or you click "Accept" below then you are consenting to this.

Close