চাষের জমিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল: কাজ বন্ধ রেখে ডানকান চা বাগানে শ্রমিক বিক্ষোভ

13516ডেস্ক রিপোর্টঃ হবিগঞ্জে ডানকান ব্রাদার্সের চান্দপুর চা বাগানের ধানি জমিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রতিবাদে আন্দোলনে নেমেছেন চা শ্রমিকরা। ফলে চারদিন থেকে কাজ বন্ধ রয়েছে এই বাগানের। ১৮৯০ সাল থেকে বংশপরম্পরায় ভোগ করে আসা এ জমি ছাড়তে চাইছেন না চা শ্রমিকরা। সরকারের এ সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে ১৩ ডিসেম্বর থেকে বাগানের সব কাজ বন্ধ রেখে বিক্ষোভ করে আসছেন তারা। ইতিমধ্যে এ জমি ডানকান থেকে ইজারামুক্ত করে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) কাছে হস্তান্তরও করা হয়েছে।
বুধবার সকাল থেকেই বিভিন্ন শ্রমিক সারি (লেবার লাইন) থেকে শ্রমিকরা জড়ো হতে থাকেন ডানকান ব্রাদার্সের চান্দপুর চা বাগানের ওই জমিতে। দুপুরের মধ্যে তা হাজারখানেক শ্রমিকের একটি সমাবেশে রূপ নেয়। বৃহস্পতিবারও দিনভর চলে বিক্ষোভ। তীর-ধনুক, বর্ষা, দা ও লাঠি নিয়ে সমাবেশে যোগ দেন শ্রমিকরা। ১৩ ডিসেম্বর থেকে কাজ বন্ধ রেখে প্রতিদিন এভাবেই চলছে শ্রমিকদের বিক্ষোভ সমাবেশ।
এদিকে শ্রমিকদের কর্মবিরতি ও বিক্ষোভের ফলে বাগান থেকে কোনো পাতা সংগ্রহ হচ্ছে না। বন্ধ রয়েছে প্রুনিং (পাতা সংগ্রহের পর গাছ ছেঁটে ছোট রাখা) ও প্লাকিংসহ (গাছ থেকে পাতা সংগ্রহ) অন্যান্য কাজও। বাগানের পাহারাদাররাও জমি ফেলে রেখে যোগ দিচ্ছেন সমাবেশে। পাতা সংগ্রহ না হওয়ায় বন্ধ রয়েছে উৎপাদন। এতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাগান কর্তৃপক্ষ।
ডানকান ব্রাদার্সের চান্দপুর চা বাগানের ব্যবস্থাপক শামীম হুদা বলেন, এখন বাগানে প্রুনিং সিজন চলছে। দুই সপ্তাহের মধ্যে প্লাকিং বন্ধ হয়ে গেলে পূর্ণমাত্রায় প্রুনিং চালু হবে। এখন পাতা তোলার মৌসুম না হলেও প্রতিদিন তিন হাজার কেজি চা পাতা উৎপাদন হতো। বিক্ষোভের কারণে তা বন্ধ রয়েছে। সময়মতো প্রুনিং করতে না পারলে তার প্রভাব পরবর্তী বছরেও পড়বে। সার্বিকভাবে বাগানের ব্যাপক ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। জমি ইজারামুক্ত করার বিষয়ে সরকারের তরফ থেকে কিছু জানানো হয়নি।
শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১২ ডিসেম্বর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে শ্রমিকদের বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য হস্তান্তর করা জমি খুঁটি গেড়ে চিহ্নিত করা হবে। এক্ষেত্রে শ্রমিকদের সহযোগিতাও চাওয়া হয়। এ ঘটনার পর থেকেই জমিতে অধিকার বজায় রাখতে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করেন তারা। এমনকি নিজেদের জমিতে ধান কাটাও বন্ধ রেখেছেন শ্রমিকরা।
ক্ষেতের পাকা ধান না কেটে গতকাল অনেকের মতোই বর্ষা নিয়ে সমাবেশে যান চা শ্রমিক সুবাস তন্তুবাই। তিনি বলেন, ‘ধান কাটলে সরকার জমি নিয়ে নেবে। জমিতে ধান রয়েছে বলেই এখনো কারখানা বানায়নি। যে করেই হোক, এ জমি রক্ষা করবই। ’
আরেক চা শ্রমিক রুবল ওরাওঁ বলেন, ‘আমরা এ জমি দেব না। এখানে অর্থনৈতিক অঞ্চল আমরা চাই না।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাশহুদুল কবীর বলেন, আইনগতভাবে জমি ডানকান ব্রাদার্সের কাছ থেকে ইজারামুক্ত করে অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এখানে অর্থনৈতিক অঞ্চল হলে এক লাখ লোকের কর্মসংস্থান হবে। অদক্ষ শ্রমিকও প্রয়োজন হবে। এছাড়া অর্থনৈতিক অঞ্চল হলে পার্শ্বব্যবসার সুযোগ তৈরি হবে; যার মাধ্যমে চা শ্রমিকরা জীবিকা নির্বাহ করতে পারবেন। শ্রমিকদের সঙ্গে বহুবার আলাপ করেও কোনো লাভ হয়নি। তারা কিছুতেই বিষয়টি বুঝতে চাইছেন না। কিছু লোকের ইন্ধনে তারা জমি ছাড়বেন না বলে গোঁ ধরে আছেন।
পুরনো ঢাকা-সিলেট মহসড়কের উভয় পাশে হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলায় ৩ হাজার ৯৫১ একর জমির ওপর চান্দপুর বাগান। বাগানের মধ্যে চাষাবাদের জন্য নির্ধারিত এ জমি ক্ষেতল্যান্ড নামে পরিচিত। বাগানের মোট ৯৮৫ একর ক্ষেতল্যান্ডের মধ্যে অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য ৫১১ একর বেজার অনুকূলে হস্তান্তর করা হয়েছে।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এ বাগানে মোট ১ হাজার ৯৫৫ জন শ্রমিক রয়েছেন। এর মধ্যে স্থায়ী শ্রমিক ১ হাজার ৬৫৫ ও অস্থায়ী শ্রমিক ৩০০ জন। শ্রমিকদের পরিবারের সদস্যসহ বাগানে বসবাসরত মোট জনসংখ্যা ৮ হাজার ৮৩৩। এর মধ্যে যারা বাগানে কাজ করেন, তারা শুধু দৈনিক ৮৫ টাকা করে মজুরি পেয়ে থাকেন। যাদের বাগানে কাজ নেই, তারা এ জমির ওপর নির্ভরশীল। ইজারা অনুযায়ী, বাগান কর্তৃপক্ষের মালিকানা থাকলেও বংশপরম্পরায় এসব জমিতে শ্রমিকরাই চাষাবাদ করেন।
জানা গেছে, ভূমি মন্ত্রণালয় গত ২৬ আগস্ট অকৃষি খাসজমি দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্ত মামলার মাধ্যমে চুনারুঘাটের চান্দপুর টি জি মৌজার ৫১১ দশমিক ৮৩ একর জমি বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যানের কাছে বন্দোবস্তের প্রস্তাব অনুমোদন করে। ২১ সেপ্টেম্বর ১/১ খতিয়ানে রেকর্ড সংশোধন করা হয়। আর ২১ নভেম্বর তা বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যানের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এ জমিতে ১২৫ বছর ধরে চাষাবাদ করে এলেও চা শ্রমিকদের কোনো ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়নি। চা শ্রমিকদের মধ্যে সাঁওতাল, মাঝি, কর্মকার, মৃধা, রবিদাশ, বুনার্জি, পাল, শীল, বাউরি, রাজবংশী, মাল, কড়া, কানো, পাত্র, ওরাওঁ, ভূমিজ, নায়েক, গোয়ালা, কালিন্দি, তন্তুবাই, তাঁতী, রাই, ভূঁইয়াসহ বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠী এ বাগানে বাস করে।