টান টান উত্তেজনায় সাকার দাফন সম্পন্ন – বাবার প্রতিষ্ঠান চত্বরে মুজাহিদের দাফন

hh7RnpBq49ne_originalসুরমা টাইমস ডেস্কঃ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর অ্যাম্বুলেন্সে করে তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার তার পৈত্রিক বাড়িতে। সেখানেই বায়তুল বিলালের পারিবারিক কবরস্থানে রোববার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তার দাফন সম্পন্ন হয়। এরআগে সকাল ৯টার দিকে তার মরদেহ পৌঁছায় সেখানে।
সকাল ৯টা ১০ মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ডেপুটি জেলার মাজহার বিপ্লবের কাছ থেকে সাকার মরদেহ বুঝে নেন তার ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী। এর মিনিট দশেক পরেই সাকার জানাজার নামাজ পড়া হয়। হেফাজত ইসলামের সিনিয়র নায়েবে আমির মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী জানাজার নামাজ পড়ান।
এর আগে শনিবার রাত ৩টার পর থেকে সেখানে পুলিশ পাহারায় কবর খোঁড়া শুরু হয়। সাত থেকে আটক জন গোড়খোদক খননের কাজ করেন।
তবে দাফনের আগে তার জানাজা নিয়ে শুরু হয় উত্তেজনা। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বাড়ি থেকে আধা কিলোমিটার দূরে গহিরা কলেজ মাঠে জানাজা আয়োজন করতে চায় স্থানীয়রা। তবে প্রশাসনের বাধায় তা বন্ধ হয়ে যায়। পরে তার বাড়ির পাশেই জানাজার নামাজ পড়া হয়।
এদিকে যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মরদেহ প্রতিরোধে রাউজান উপজেলার প্রবেশ পথসহ বিভিন্ন পয়েন্টে মধ্যরাত পর্যন্ত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ও মুক্তিযোদ্ধারা অবস্থান নিলেও পরে পুলিশের তৎপরতায় তারা সরে যায়।
শনিবার রাত ২টা ৫৩ মিনিটে চট্টগ্রামের উদ্দেশে ছেড়ে আসে সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স। এর আগে রাত ১২টা ৫৫ মিনিটে সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর ফাঁসি কার্যকর হয়। ফাঁসি কার্যকরের তথ্য নিশ্চিত করেন আইজি (প্রিজন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইফতেখার উদ্দিন।
সাকা চৌধুরীর ফাঁসি কার্যকরের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরপরই সাকার মরদেহ পরিবহন নির্বিঘ্ন করতে রাত সাড়ে ১০টার পর থেকে চট্টগ্রামের অক্সিজেন থেকে হাটহাজারী হয়ে রাউজান পর্যন্ত বিপুল সংখ্যক র‌্যাব-পুলিশ ও বিজিবি মোতায়ন করা হয়েছে। সাকার মরদেহ যাতে কোনো বাধার মুখে না পড়ে সেজন্য সড়কে কাউকে অবস্থান করতে দেয়া হবে না বলেও আগে থেকেই জানিয়ে দেন চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার এ কে এম হাফিজ আক্তার।

এদিকে ফরিদপুর শহরের পশ্চিম খাবাসপুরে মুজাহিদের বাড়ির পাশে তার বাবার নামে স্থাপিত মাওলানা আব্দুল আলী ফাউন্ডেশন চত্বরে জানাজার পর সকাল সোয়া ৭টার দিকে আইডিয়াল ক্যাডেট মাদরাসা সংলগ্ন স্থানে তাকে দাফন করা হয়। সকাল ৬টা ৩৫ মিনিটের দিকে তার মরদেহবাহী গাড়ির বহরটি ফরিদপুর শহরের পশ্চিম খাবাসপুরে নিজ বাড়িতে পৌঁছায়। পরে মাওলানা আব্দুল আলী ফাউন্ডেশন চত্বরে জানাজার জন্য মরদেহ নেয়া হয়।
সকাল ৭টার দিকে জানাজা শেষে উপস্থিত স্বজন ও নেতাকর্মীদের মরদেহ দেখানো হয়। এসময় মুজাহিদের পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা ছাড়াও জামায়াত-শিবিরের কয়েকশ নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। এর আগে রাত ৩টার দিকে কবর তৈরির কাজ শেষ হয়। তারপর থেকে স্বজন ও দলীয় নেতাকর্মীরা অপেক্ষা করছিলেন মরদেহের জন্য।
১৯৭১ সালে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ২০১৩ সালের ১ অক্টোবর সাকা চৌধুরীকে ফাঁসির আদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। পরে ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করেন সাকা চৌধুরী। আপিলের রায়ে তাঁর মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল থাকে। আপিল বিভাগের দেয়া পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয় ৩০ সেপ্টেম্বর। এর ১৪ দিনের মাথায় ওই রায় পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন করেন সাকা চৌধুরী।
২০ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের অবকাশকালীন চেম্বার আদালত ওই আবেদন শুনানির জন্য ২ নভেম্বর দিন নির্ধারণ করেছিলেন। পরে সাকা চৌধুরীর আইনজীবীর সময়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শুনানির তারিখ ১৭ নভেম্বর পুনর্নির্ধারণ করেন আপিল বিভাগ। কিন্তু সাকা চৌধুরীর আইনজীবীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শুনানি একদিন পিছিয়ে দেন আদালত।
১৮ নভেম্বর বুধবার প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চার সদস্যের বেঞ্চ সাকা চৌধুরীর ফাঁসির রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন খারিজ করে দেন। ফলে চূড়ান্ত আদেশেও তার ফাঁসি বহাল থাকে। ফাঁসির রায় বহাল থাকায় সাকা চৌধুরীর সামনে সর্বশেষ রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাওয়ার সুযোগ ছিল।
পরে বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ৯টায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সিনিয়র সহকারী জজ আফতাবুজ্জমানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল রায়ের অনুলিপি নিয়ে কেন্দ্রীয় কারাগারে পৌঁছায়। সেদিন রাতেই সাকার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। ডা. বিপ্লব কান্তি বিশ্বাস ও ডা. হাফিজ তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন। শুক্রবার সকালে ডা. বিপ্লব কান্তি বিশ্বাস গণমাধ্যমকে বলেন, ‘তিনি শারীরিকভাবে সুস্থ আছেন।’
ওইদিন বেলা ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে কোনো এক সময়ে সিনিয়র জেলসুপার জাহাঙ্গীর কবির তার সামনে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনার বিষয়ে প্রশ্ন রাখেন। এসময় সাকা জানান, তার আইনজীবীর সাথে কথা বলে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবেন। ফলে সকল প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও এই কারণে ওইদিন তার ফাঁসি কার্যকর করা যায়নি।
শনিবার দুইজন ম্যাজিস্ট্রেট কারাগারে সালাউদ্দিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে প্রাণভিক্ষার ব্যাপারে জানতে চান। পরে সালাউদ্দিন রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করেন। যদিও পরিবার ও তার দল বিষয়টিকে মিথ্যা বলে দাবি করেছে।
প্রাণভিক্ষার সেই আবেদন প্রথম যায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতামত দেয়ার পর নথি যায় আইনমন্ত্রীর কাছে। আইনমন্ত্রীও মতামত দেয়ার পর প্রাণভিক্ষার ফাইল নিয়ে যাওয়া হয় রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের। রাত ৯টার দিকে আইনসচিব বেরিয়ে আসেন রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে। রাষ্ট্রপতি প্রাণভিক্ষার আবেদন নাকচ করার পরই শুরু হয় দণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া।
ডাকা হয় তার পরিবারের সদস্যদের। রাত রাড়ে ৯টার দিকে মূল ফটক দিয়ে তাদের কারাগারে প্রবেশ করানো হয়। শেষ দেখার পর রাত ১০টা ৫০ মিনিটে তারা কারাগার থেকে বের হয়ে যান।
উল্লেখ্য, ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়ার পর ২০১৩ সালের ২৯ অক্টোবর রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন সাকার আইনজীবীরা। আপিল আবেদনে মোট ১ হাজার ৩২৩ পৃষ্ঠার নথিপত্রে বিভিন্ন ডকুমেন্টসহ ২৭টি গ্রাউন্ড ছিল।

Pin It on Pinterest

Share This

By continuing to use the site, you agree to the use of cookies. more information

The cookie settings on this website are set to "allow cookies" to give you the best browsing experience possible. If you continue to use this website without changing your cookie settings or you click "Accept" below then you are consenting to this.

Close