মরি এ কী লজ্জায়! : ইসমত পারভীন রুনু

Razon Square2 (2)সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা, অন্যায়ের প্রতিবাদ, মানবিক গুণাবলির চর্চা, সভ্যতা, সংস্কৃতি, সহিংসতার বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ, পারিবারিক রীতি-নীতির প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন, এ সমস্ত মানবীয় গুণাবলি আজ আর তেমন প্রভাব বিস্তার করে না সমাজে আগের মতো।
দেশব্যাপী যে নারকীয় নৃশংসতা, মানবিক মূল্যবোধ বিবর্জিত কর্মকা-ের ভয়াবহ উত্থান, তা আমাদের বিস্মিত, হতবাক করে। স্বাধীনতার এতো বছর পরও এমন লোমহর্ষক ঘটনা অবলোকন করতে গিয়ে রীতিমত অপ্রস্তুত হই, বিব্রত ও লজ্জিত হই। শিশু অপহরণ, শিশু নির্যাতন, ভয়ংকর সব শিশু হত্যাকা-, শিশু মুক্তিপণ আদায়, শিশু ধর্ষণ, এই অরাজক পরিস্থিতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমাদের সোনামণিরা আদৌ ভালো নেই, নিরাপদে নেই।
একটা সময় ছিল একমাত্র নারী জাতিই অপ্রত্যাশিত নির্মমতা, পাশবিক নিষ্ঠুরতা, অমানবিক নির্যাতন কিংবা চরম নৃশংসতার শিকার হতো। যদিও সে অবস্থার অনেকটাই পরিবর্তন হচ্ছে। কিন্তু আমরা কী দেখছি, শিশুরা আজ নিরাপত্তাহীনতার পাশাপাশি নানা বর্বরতার শিকার। গত ৮ জুলাই, ২০১৫ সিলেটের কুমারগাঁও এ সামিউল ইসলাম রাজনের ভাগ্যে কী ঘটেছিলো? কী অপরাধ ছিলো ছোট্ট রাজনের? পৈশাচিকতার এ কেমন উদাহরণ! হাতেগোনা কয়েকজন মানবতা বিরোধীর এতো দাপট? কারা এরা?
নরপশুদের ঘৃণ্য তা-ব কোমলমতি শিশুদের ভীত সন্ত্রস্ত করে তুলছে প্রতিনিয়ত। বাধাগ্রস্থ হচ্ছে শিশুদের নিরাপদ বেড়ে ওঠা, ভবিষ্যৎ স্বপ্ন। দুষ্ট একটি চক্র, মানুষরূপী হায়েনারা এ কেমন আচরণ করছে শিশুদের প্রতি। বিকারগ্রস্ততা মানুষকে এতটাই অন্ধ করে দেয়, ভাবা যায় না। অনেক সামর্থ্যবান, শিক্ষিত পরিবারের ছেলেরাও আজকাল বাবা-মাকে দুমুঠো খেতে দেয় না, কিংবা পরিপূর্ণভাবে দায়িত্ব নিতে চায় না। অথচ আমাদের ছোট্ট রাজন, দায়িত্ব নেয়ার বয়স হয়নি, তারপরও স্বেচ্ছায় সে দায়িত্বটি নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলো। তাছাড়া রাজন মিথ্যে বলতেও শেখেনি। তাইতো বার বার বলছিলো, ‘আমি চুরি করিনি, আমি চোর নই’। কী অকৃতজ্ঞ সেই মনুষ্যত্বহীনেরা!
চুরির অপবাদ দিয়েও থেমে থাকেনি, ওইটুকু আদরের শরীরে ৬৪টি আঘাতের চিহ্ন! আঘাতে আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত করেছে ছোট্ট দেহটিকে। বিকৃত আনন্দ-উল্লাসে আÍহারা হয়ে ওঠে অসুস্থ মানসিকতার সেই মানুষগুলো।
তারপরও সাহস সঞ্চয় করে ক্ষীণ কণ্ঠে প্রতিবাদ করেছে, হাড়ে মেরোনা আমায়, প্রচ- ব্যথা, হাড় বাদ দিয়ে মারো। আঘাতের পাশবিকতায় ক্রমশ কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলো। বাঁচার জন্য কী তীব্র আকুতি! সে আকুতি হৃদয়হীন, অমানুষদের কানে পৌঁছেনি। সমাজের আট-দশজনের কানেও রাজনের সে অস্ফুট চিৎকার পৌঁছেনি। লোহার রডের আঘাতে ক্রমান্বয়ে কান্ত ও দূর্বল হয়ে পড়েছিলো রাজনের দেহটি।
বাঁচার জন্য নিঃস্বার্থ একমাত্র অবলম্বন মাকে কতবার ডেকেছিলো, ‘মাগো, আমাকে বাঁচাও, ওরা আমাকে মেরে ফেলবে’। মা রাজনের ডাক শুনতে পাননি, বাঁচাতেও পারেন নি। কী অসহায় সেই মা, রাজনের মতো সোনামণির মা ডাক থেকে বঞ্চিত হলেন চিরতরে। আঘাতের তীব্রতায় বেশিক্ষণ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না রাজন। এক সময় উপলব্ধি করলো সে আর বাঁচতে পারবে না, তাই শেষ ইচ্ছের কথা জানালো, ‘একটু পানি চাই’। কী নির্দয়, কী পাষ- সেই অধমেরা! শেষ ইচ্ছেও অপূর্ণ থাকলো রাজনের। এক বুক অভিমান নিয়ে নিথর দেহ মুহূর্তেই মাটিতে পড়লো। লাশ গুম করার পরিকল্পনাও তাদের ছিলো। পরবর্তীতে আর তা সফল হয়নি।
অবশেষে সবাইকে কাঁদিয়ে, বাবা-মাকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে এ কলঙ্কিত পৃথিবী থেকে রাজনের চলে যাওয়া নিশ্চিত হলো। অপমানে, ঘৃণায়, সহানুভূতিতে বার বার চোখ ভিজে আসে। তাহলে কী নতুন প্রজন্মের জন্য এখনও এ পৃথিবী বাসযোগ্য হয়নি?
আজ বিশ্ববিবেক জেগে উঠেছে তোমার নির্মম হত্যাকা-ের প্রতিবাদে। বিচার তাদের হবেই। অসংখ্য রাজন আজ জেগে থেকে অধিকার আদায়ের লড়াই করছে, সম্মিলিত সামাজিক শান্তিকামী মানুষ আজ এক হয়ে আন্দোলন করছে, মানব বন্ধন করছে সর্বত্র। শুধু জেগে নেই তুমি, তবে তুমি বেঁচে থাকবেই মানুষরূপী পশুদের ধিক্কার হয়ে, সব নির্যাতনের প্রতিবাদী ভাষা হয়ে। তোমার এ নিষ্ঠুর হত্যাকা-ে আমরা ক্ষুব্ধ, ব্যথিত, লজ্জিত, মর্মাহত! তুমি শান্তিতে ঘুমাও রাজন!

লেখিকাঃ সংস্কৃতিকর্মী ও সংগঠক, সিলেট।

Pin It on Pinterest

Share This

By continuing to use the site, you agree to the use of cookies. more information

The cookie settings on this website are set to "allow cookies" to give you the best browsing experience possible. If you continue to use this website without changing your cookie settings or you click "Accept" below then you are consenting to this.

Close