দেড় কোটি জনতার ভালবাসার রুশনারা পুনঃনির্বাচিত : সিলেটে আনন্দের বন্যা

British-MP-Rushnara-Ali সুরমা টাইমস রিপোর্টঃ আবারও বিপুল ভোটে জয়ী হলেন সিলেটী বংশদ্ভূত রুশনারা আলী। গণতন্ত্রের সূতিকাগার ব্রিটেনের এবারের সাধারণ নির্বাচনে সিলেট জুড়ে বিরাজ করেছিল এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি। হয়ত ব্রিটেনের এই নির্বাচন সিলেটে কোন প্রভাবই রাখতে পারবেনা কিন্তু পুরো সিলেট বিভাগের দেড় কোটি জনতার দোয়া ও ভালবাসায় সিক্ত রুশনারার জন্য সিলেটের সর্বস্তরের জনগনের মধ্যে রাতভর (ব্রিটেনে নির্বাচনের দিন) ছিল উত্তেজনা। তবে সকল শঙ্কার কাটিয়ে আবারাও বিপুল ভোটে পূনঃনির্বাচিত হয়ে বিশ্বের বুকে গোটা সিলেটের দেড় কোটি জনতার ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে।
পূর্ব লন্ডনের বেথনাল গ্রিন অ্যান্ড বো আসনে জয় পেয়েছেন রুশনারা। ২৪,৩১৭ ভোটের বিশাল ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন তিনি। রুশনারা পেয়েছেন ৩২,৩৮৭ ভোট এবং তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কনজারভেটিভ প্রার্থী ম্যাথিউ স্মিথ পেয়েছেন মাত্র ৮,০৭০ ভোট। ৫ বছর আগে প্রথমবার বৃটিশ এমপি নির্বাচিত হন সাবেক লেবার পার্টির সদস্য রুশনারা। তার দেখানো পথে হেঁটে আরও ‘দুই বাংলাদেশী কন্যা’ বৃটেনে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করলেন। সিলেটি বংশোদ্ভূত রুশনারা তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কনজারভেটিভ প্রার্থীকে বিশাল ব্যবধানে পরাজিত করেছেন। ২০১০ সালের নির্বাচনেও নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীকে ১১ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন তিনি।
রুশনারা আলী পুনরায় বিজয়ী হওয়াতে সিলেটবাসীর মধ্যে বইছে আনন্দের বন্যা। কেউ কেউ ইতোমধ্যে মিষ্টি বিতরণ করেছেন। আবার কেউ কেউ গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে রুশনারাকে অভিনন্দনও জানাচ্ছেন।
বিবৃতিতে তারা জানিয়েছেন, ‘এ বিজয় আমাদের জন্য শুধু আনন্দ নয়, এটি আমাদের গৌরবেরও ব্যাপার। এ বিজয় প্রবাসী নতুন প্রজন্মকে উজ্জীবিত করবে।’
তিনি বলেন, ‘রুশনারা আলীর বিজয় বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। এ বিজয়ে ব্রিটেন-বাংলাদেশের মধুর সম্পর্ক আরো দৃঢ় হবে।’
নির্বাচনে ইতিমধ্যে জয়ী হয়েছেন ড. রূপা হক ও বঙ্গবন্ধু নাতনি টিউলিপ। ড. রূপা হক ৩৪ শতাংশ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। আর টিউলিপি নির্বাচিত হন ৪৪ শতাংশ ভোটে। তবে সবচেয়ে বেশি ভোটের ব্যবধানে নির্বাচিত হয়েছেন রুশনারা আলী।
ব্রিটিশ পার্লামেন্টে লন্ডনের হ্যাম্পস্টেড অ্যান্ড কিলবার্ন আসনের প্রতিনিধিত্ব করবেন বঙ্গবন্ধুর নাতনি টিউলিপ সিদ্দিকী। বৃহস্পতিবার দিনভর ভোটাভুটি শেষে অধিকাংশ আসন থেকে লেবার প্রার্থীদের পরাজয়ের খবর আসতে থাকলেও ১১৩৮ ভোটে ক্ষমতাসীন কনজার্ভেটিভ পার্টির প্রার্থীকে পরাজিত করেন টিউলিপ। জয়ের পথে টিউলিপ সিদ্দিকী পেয়েছেন ২৩ হাজার ৯৭৭ ভোট। আর কনজার্ভেটিভ পার্টির সাইমন মার্কাস পেয়েছেন ২২ হাজার ৮৩৯ ভোট। এদিকে ২৭৪ ভোটের ব্যবধানে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট নির্বাচনে জয় পেয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রূপা আশা হক। ৪৩ বছর বয়সী রূপা ব্রিটিশ পার্লামেন্টে উত্তর-পশ্চিম লন্ডনের ইলিং সেন্ট্রাল অ্যান্ড অ্যাকটন আসনের প্রতিনিধিত্ব করবেন। বৃহস্পতিবার এই নির্বাচনে লেবার পার্টির প্রার্থী রূপা পেয়েছেন ২২ হাজার ২ ভোট। আর ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির প্রার্থী এনজি ব্রে পেয়েছেন ২১ হাজার ৭০১ ভোট। যুক্তরাজ্যের জাতীয় নির্বাচনে ভোট গ্রহণ শেষে এখন চলছে ভোট গণনা। ভোটের ফলাফলও হাতে আসতে শুরু করেছে। তবে, কোনও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা কোন দল পাবে না বলেও আভাস দিয়েছে সেই জরিপ। এক্সিট পুল জরিপের তথ্য মতে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরুনের দল কনজারভেটিভ পার্টি পাবে ৩১৬টি আসন। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে যা মাত্র ১০টি আসন কম। কেননা একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা পেতে হলে দরকার ৩২৬টি আসন। এছাড়া, প্রধান বিরোধী দল লেবার পার্টি পাবে ২৩৯টি আসন। মোট ৬৫০টি আসনের মধ্যে সর্বশেষ ৯৭টি আসনের ফল পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৩৭টি আসন পেয়েছে লেবার পার্টি, কনজারভেটিভ পার্টি পেয়েছে ২৪টি আর স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি পেয়েছে ২২টি আসন।
ইতিহাস সৃষ্টিকারী এই রুশনারা আলী ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশে জন্ম নেন সিলেট জেলার বিশোয়ানাথ গ্রামে। তিনি মাত্র ৭ বছর বয়সে পরিবারের সাথে লন্ডনের পূর্ব প্রান্তে অভিবাসিত হন যেখানে তিনি মালবেরি স্কুলস অব গার্লস ও টাওয়ার হ্যামলেট কলেজ-এ শিক্ষা লাভ করেন। টাওয়ার হ্যামলেটে বেড়ে ওঠার সময়ে তার বাবা হাতের কাজ করতেন।অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট জনস কলেজে তিনি দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করেন যা ছিল তার পরিবারের জন্যই প্রথম ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার।
মাইকেল ইয়ং-এর গবেষণা সহকারী হিসেবে তিনি তার কর্মজীবন শুরু করেন ও টাওয়ার হ্যামলেটস সামার বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সংস্কার প্রজেক্টের কাজ করেন, যেখানে মুক্ত শিক্ষার কর্মসূচী চালু আছে ১১ থেকে ২৫ বছর বয়সীদের জন্য।ভাষা সংযোগ-এর উন্নতির জন্য তিনি কাজ করেন যা একটি জাতীয় দূরালাপনী ব্যাখাকারী কর্মকান্ড যেখানে ১০০টির মতো ভাষায় এটা করা হয়।১৯৯৭ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত তিনি সংসদ সহকারী ছিলেন সংসদ সদস্য ওনা কিং-ইয়ের যিনি বেথনাল গ্রিন এ্যান্ড বাউ জন্য মনোনীত ছিলেন। মানবাধিকার বিষয়ে তিনি বিদেশী কার্যালয়ে কাজ করেন ২০০০ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত। এর আগে আলী একজন গবেষণা সহযোগী হিসেবে কাজ করেন আই পি পি আরে। বার্নলে, ওল্ডহ্যাম ও ব্র্যাড ফোর্ডে ২০০১ সালের দাঙ্গার ফলে স্থানীয় ও জাতীয় মাধ্যমকে গতিশীল করার জন্য একটি কর্মকান্ডের নেতৃত্ব দেন তিনি যা সম্ভব হয়েছিল ২০০২ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত হোম অফিসের কমিউনিটিস ডাইরেক্টরেট হিসেবে কাজ করে এবং এটা করা হয়েছিল যাতে আর কোন রকম বিশৃংখলা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি না হয় ও কেন্দ্রীয় সরকারকে কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়ার জন্য। রুশনারা আলী ২০০৫ সাল থেকে বেথেল গ্রিনে অবস্থিত ইয়ং ফাউন্ডেসন-এর সহকারী পরিচালক যারা নতুন ধরনের সামাজিক বিষয়ে আলোকপাত করেন। তিনি একই সাথে টাওয়ার হ্যামলেটস সামার বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সদস্য,একজন কমিশনার লন্ডন শিশু দারিদ্র কমিশনের, বোর্ড সদস্য টাওয়ার হ্যামলেট কলেজের , পল হ্যাম্লাইন ফাউন্ডেশনের ট্রাস্টি ও টেট ব্রিটেন কাউন্সিলের সদস্য। দ্যা গার্ডিয়ান, প্রসপেক্ট ও প্রগ্রেস ম্যাগাজিনে তিনি জাতীয় ও স্থানীয় নানা রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছেন। এছাড়াও তিনি কোয়েশ্চন টাইম এক্সট্রা , বিবিসি রেডিও ৪-এর ওমেন্স আওয়ার এবং থিঙ্কিং অ্যালোড-এ উপস্থিত হন। দ্যা গার্ডিয়ানের মতে তিনি ব্রিটেনের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী মহিলাদের একজন।
২০০৭ সালে এপ্রিলে লেবার পার্টির পক্ষ থেকে নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য বেথনাল গ্রিন এ্যান্ড বাউ এলাকার জন্য নির্বাচিত হন ও ৬ই মে ২০১০ সালে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ১১৫৭৪ ভোট বেশি পেয়ে। তিনি হাউজ অব কমনসে নির্বাচিত প্রথম বাংলাদেশী ও ২০১০ সালে নির্বাচিত প্রথম ৩ জন মুসলিম মহিলা এমপির অন্যতম।
পরে ২০১৪ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তিনি সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন। পদত্যাগের কারন হিসাবে তিনি উল্ল্যেখ করেন কোয়ালিশন সরকার ইরাকের এই এস এই এল এর বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে তা তিনি মেনে নিতে পারেন না। তিনি মনে করেন যুদ্ধ কোন সমাধান নয়। বরং আরও এ ধরনের যুদ্ধ আরও রক্তাক্ত আগামি তৈরি করবে। তবে তিনি তার দলের প্রধানের জন্যে পদত্যাগ পত্রে শুভ কামনা করেন এবং বলেন তিনি বিশ্বাস করেন আগামি নির্বাচনে তার দল জিতবে। অন্যদিকে লেবার দলের প্রধান বলেন রুশনারার নিজের সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান জানিয়েই তার পদত্যাগ পত্র গ্রহন করা হয়ছে।

Pin It on Pinterest

Share This

By continuing to use the site, you agree to the use of cookies. more information

The cookie settings on this website are set to "allow cookies" to give you the best browsing experience possible. If you continue to use this website without changing your cookie settings or you click "Accept" below then you are consenting to this.

Close