বৈশাখ আসে, বাঙ্গালী আবার বাঙ্গালী হয়!

মীর আব্দুল আলীম 

Mir Abdul Alimবছর ঘুরে বৈশাখ আসে, আর আমরা ক্ষনিকের বাঙ্গালী হয়ে যাই! বাঙ্গালী হতে দিকবিদিক ছুটি। মাসটার পহেলাতে ঢাকা শহরেতো হাঁটাবার জায়গাও থাকে না। বাঙ্গালী হতে অনেকেই ঘর থেকে ছোঁটেন, আমি সচরাচর ঘরেই কাঁটাই দিনটা। পহেলা বৈশাখের এই দিনে, আমি একদিনের বাঙ্গালী হতে চাইনা। বৈশাখের ঐ বিশেষ দিনটাতে সকালে পান্তা; শুটকিভর্তা ইলিশ খাইনা। শহরে থাকলেও শরীর থেকে গাঁয়ের (গ্রামের) গন্ধ মুছে যায়নি এখনও; মন থেকে মুছে ফেলিনি বাঙ্গালীআনা। ঘন্টা, মাস, বছর ধরেই নিজেকে বাঙ্গালী ভাবি। গত বৈশাখেও আমি বাসায় বসে লিখছি। বাসা একেবারে ফাঁকা। সেদিন পরিবারের সবাই বাঙ্গালী হতে ছুটে গেছেন রমনা বটমুলে। বাসায় যারা কর্ম করেন তারাও কেউ ছিলেন না। সবাই একদিনের বাঙ্গালী সাজে বেরিয়ে পরেন ঘর থেকে। সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়। মসজিদের আজান শুনতে পাই। পেটে বেশ টান ধরেছে। মনে হলো মাঝে মধ্যেইতো নোনাইলশে,পান্তা, শুটকি খাই; বৈশাখের এই দিনটাতে না হয় বিরিয়ানি খাওয়া যাক। হাই প্রেশারের রোগী তবুও মতিঝিলের হাজীর বিরানী খেলাম পেটপুরে। বাসায় ফিরার সময় ক্যাপিটাল থেকে বার্গার, পেস্টি আর স্যান্ডুইস কিনে নিলাম ক’পিছ। ছেলে দু’টুর বেশ পছন্দ ওগুলো। সহজে কিনে দেই না বিদেশী ধাঁচের এসব খাবার। আমার অগোচরে বেইলী রোডে গিয়ে খায় মাঝে মাধ্যে। গত বৈশাখে কেন জানি নষ্ট সমাজের কষ্টবাড়ানো ঐ খাবার গুলোই কিনেছিলাম ওদের জন্য। ঘরে কখনো মুড়িমুড়কি,কড়িমুড়ালি, নিমকি কিংবা জিলাপি এনেছিতো আমার ছোট ছেলেটা ভেংচি কাঁটে। ওদের এগুলো মোটেও পছন্দ নয়। বড় ছেলেটাতো বলেই ফেলে বাবা এগুলো ব্যাকডেটেড খাবার। রাগ করিনা। ভাবি ওদের কি দোস? আমরাইতো ওদের সাহেব বানিয়ে ফেলেছি। ওরা বলে পান্তায় নাকি লাখ লাখ ব্যাক্টিরিয়া জন্মে। আমারা দাদাতো এগুলো খেয়েই ১ শত ২২ বছর পার করেছেন। মৃত্যুর আগে কোন রোগবালাই দেখিনি। হাসপাতালে যাননি কখনও। জীবনের শেষ দিনের সকালেও বিনে চশমায় পত্রিকার পড়েছেন। তিনি পাট ব্যবসায়ী ছিলেন। অর্থকড়ি কমতি ছিলনা। তবুও তার খাবার তালিকায় ছিল কেবলই বাঙ্গালী খাবার। বিচিকলা, বাঙ্গী, খিরাই,মিষ্টি আলু, ডাল ভাত ছিলো প্রিয় খাবার। আমার গিন্নী মাঝে মধ্যে মোড়গ পালাও কিংবা কাচ্ছি বিরিয়ানী পাকালে বলতেন “ওসব ছাইপাশ দিওনা ভাত দাও।” ভাতের মতই সোজাসাপটা কথা দাদার। বাবার মাঝেও ভাব দেখিনি কখনও। বাঙ্গালী মেজাজেই চলেন এখনও। খাবারদাবারেও এখনও তিনি ষোল আনা বাঙ্গালী। দিন যত গড়াচ্ছে, ভাবি ছেলে গুলো বাঙ্গালী থাকবে তো? ভিনদেশী দাপটে ওদের বাঙ্গালী রাখাইতো কষ্ট সাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘরে বাহিরে কোথাও বাঙালীআনা নেই। প্রাশ্চত্ব ঢং সবখানে। পোশাকে, খাবারে, চলা ফেরা সব খানেই ভিনদেশী ভাব। কি সাহিত্যে, কি চলচিত্রে সব জায়গায়ই বাঙ্গালী হটাও মনভাব। শতাধীক টিভি চ্যানেলে নাচ গান আর পরকিয়া মার্কা নাটক সিনেমায় আমাদের বাঙ্গালী থাকাই দায়। লাভইন সিংগাপুর মার্কা চলচ্চিত্র আমাদের টিভি চেনেলেরর অনুষ্ঠান সব কিছুতেই কেমন জেন সাহেবী মেজাজ। এগুলো দেখে আমাদের আগামী প্রজন্ম বাঙ্গালী থাকে কি করে? 
আমরা বৈশাখ এলেই একতারা হাতে ছুটে চলতে চাই কাঙালিনী সুফিয়ার মতো। ঢোল, তবলা, সারিন্দা নিয়ে গেয়ে উঠতে চাই হাছন আর লালনগীতি। গাইতে চাই আবদুল করিমের ‘গাড়ি চলে না চলে না চলে নারেৃ’।- কিন্তু বৈশাখ চলে গেলে আমার সেই জ্যৈষ্ঠের খর রোদ্দুরে মলিন হয়ে যাই। হতাশ হয়ে যাই কালবৈশাখীর মতো জীবনের কিছু ঝড়ের কবলে পড়ে। সব যেন শেষ হয়ে যায়। ধুঁয়ে মুছে যায় বাঙ্গালীআনা। বাসায় মায়েরা সন্তানদের নিয়ে ভিনদেশী চ্যানেলে দেখছে ‘দুর্গা’, ‘হরে কৃশ্ন হরে রাম’ কিংবা আউ আউ আউ মার্কা গান। এতো গেল বাসার খবর। আমাদের নিতিনির্ধারকরাও এব্যাপারে বেশ উদাশসীন। তারা ভিনদেশী অপসাংস্কুতিকে ভাড়ায় আনছেন। কোটি কোটি টাকা ব্যায়ে করে আনা হয় ভারতীয় শিল্পীদের। আর আনবেইনা কেন? বাঙ্গালীতো আর বসে নেই। লাখো দর্শক হুমড়ি খেয়ে পরে মাঠে। সরাসরি টিভি চ্যানেলেও ঐ অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা। অথচ আমাদের সরকার শত চেষ্টায়ও পাশ্ববর্তী ভারতে আমাদের টিভি চ্যানেল সম্প্রচারের সুযোগ পাচ্ছে না। ওরা আমাদের শিল্প সাংস্কৃতির শেয়ার নেবে না আর ওদেরটা আমাদের ধরিয়ে দেবে তা কি করে হয়। ওদের নাটক সিনেমার প্রভাব কিন্তু আমাদের সমাজে পরতে শুরু করেছে। সংসাওে অশান্তি, কুটিলতা, হত্যা বেড়ে গেছে। কি দেখছি আমরা এসব অনুষ্ঠানে। বাইজিখানায়ওতো সালিনতা থাকে। ডানাকাটা প্রায় উলঙ্গ নারী নাচিয়ে ভারতীয়রা আমাদের পকেট কেটে উড়াল দেয়। এখানেই যদি শেষ হতো না হয় কথা ছিলানা। কিন্তু লেগে থাকা ঐ আনুষ্ঠানের নোংরা বিষ্ঠা আমাদের মন থেকে কি মুছে ফেলতে পারছি আমরা ?
ডিসেম্বরের থার্টিফাষ্ট নাইট নিয়ে কিছু না বললে লেখা অপরিপূর্ণ থেকে যায়। “বেহুশ বাঙ্গালী। ফুর্তি করে খায় রঙ্গিন জুস। কেউ থাকে আধাখোলা, কেউ বা থাকে পুরা। ছুঁড়ি বুড়ি সবাই নাচে; কত নারী আপন ছেড়ে পরকে ডাকে কাছে। কে দেশি? কে বিদেশি? বোঝা বড় দায়! ‘একদিন বাঙালি ছিলামরে’ তাই মনে পইড়া যায়। এই হচ্ছে থার্টিফাষ্ট নাইট সমাচার। খুবই ঘৃণার সাথে বলতে হয় আজ আমাদের সংস্কৃতিতে চলছে বিদেশী খবরদারি ওপর। হাল জামানার যুবকরা হাছন রাজাকে গাইছে পশ্চিমা বাদ্যযন্ত্র দিয়ে। কলুষিত করছে লালন শাহর সাধকীয় ভাবশৈলীকে। সবকিছুতেই বিদেশী গল্ডধ। বিদেশী রঙ। যে রঙের ধাঁধায় পড়ে আমাদের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া রঙের মাঝে মরিচা ধরেছে। একশ্রেণীর কিশোর-কিশোরীরা যখন গিটার আর ড্রামস ছাড়া বাংলা গান কি এ সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখে না, সেও যখন হাতে একতারা বা গলায় ঢোল বেঁধে নেয় তখন বুঝতে হবে আকাশে ঝড় মেঘ জমেছে। বৈশাখ মানেই বাঙালির আটপৌরে জীবনে লালের দাপট, ঝড়ের সংকেত আর নতুনের আবাহনে স্টাইলিশ লাইফ। যেটা কেবলই ক্ষনিকের। যখন লিখেছি, যখন আপনারা লেখাটি পড়ছেন তখন হয়তো আমাদের কন্যা-জায়া-জননীগণ টিভিতে দেখছেন ‘সাস ভি কাভি বহু থি’ অথবা ওই টাইপের কিছু। আমরা মাইন্ড করিনি, কষ্ট পাই না। কষ্ট পেলেই কষ্ট হবে মনে। যা রোধ করবার নয়, কষ্ট পেয়ে লাভ কি তাতে?
আমাদের দেশে হিন্দি সিরিয়ালের ক্রেজকে একটা মহামারীর সাথে তুলনা করাটা বোধহয় ভুল হবে না। আমি অনেক পরিবারে একই সাথে বাবা-মার সাথে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়েদের গভীর মনোযোগের সাথে হিন্দি সিরিয়াল উপভোগ করতে দেখেছি। দেখেছি কীভাবে তারা অকপটে পারিবারিকভাবে গিলে যাচ্ছেন একের পর এক অসামাজিক কাহিনী যেমনঃ মালটি-ডাইমেনশনাল পরকীয়া প্রেম, বউ-শাশুড়ীর ষড়যন্ত্র, মামার সাথে ভাগ্নীর সম্পর্ক, ডিভোসের্র প্রতিযোগিতা ইত্যাদির মত জঘন্য কিছু বিষয়। এর অবশ্য একটা ভাল (??) দিক আছে। আমাদের মধ্যে অনেকেই বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের সদস্যরা বাংলার পরিবর্তে হিন্দি বলে যাচ্ছে অনর্গল। তাদের অভিভাবকরাও নিজের সন্তানের মুখ দিয়ে হিন্দি বুলি বের করে বেশ গর্ববোধ করেন। বাংলাদেশে আজকের সামাজিক অবক্ষয় আর পারিবারিক ও সামাজিক সুস্থ নিয়মনীতির ভেঙ্গে পড়ার পেছনে হিন্দি সিরিয়ালের অবদান নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়! আর এ প্রশংসার দাবিদার যারা আমাদেরকে এ জাতীয় অনুষ্ঠান যারা দেখবার সুযোগ করে দিচ্ছে তাদের। এ রাষ্ট্র এজন্য ধন্যবাদ পা বৈকি!
আমাদের সাবধান হতে হবে। বাঙালি মনকে আরও শানিত করতে হবে, মনের ভেতরকার জং মুছে ফেলতে হবে; আরও গভীর থেকে দেশকে ভালোবাসতে হবে, বাংলা ভাষাকে ভালোবাসতে হবে। আমি বাঙালি, এটা ভেতরে লালন করতে হবে। নিজেদের পরিচয় নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর মতো শক্তি জোগাতে হবে। গুরুসদয় দত্ত তার গানে বলেছিলেন ‘বিশ্বমানব হবি যদি কায়মনে বাঙালি হ, বাঙালি হ, বাঙালি হ।’ অর্থাৎ সাহস জোগাতে হবে। আত্মবিশ্বাস রাখতে হবে নিজের ভেতরে। কেবল বৈশাখে নয়, বাঙালি হয়ে যেতে হবে প্রতি ক্ষণে ক্ষণে। যেন স্মৃতি হাতড়ে না বলতে হয়, ‘একদিন বাঙালি ছিলাম রে…।- একদিন বাঙালি ছিলাম রে…।’
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট। ই-মেইল-newsstore13@gmail.com

Pin It on Pinterest

Share This

By continuing to use the site, you agree to the use of cookies. more information

The cookie settings on this website are set to "allow cookies" to give you the best browsing experience possible. If you continue to use this website without changing your cookie settings or you click "Accept" below then you are consenting to this.

Close